বিগত সরকারের টানা দেড় যুগের শাসনামলে রাষ্ট্রের পরতে পরতে যে বৈষম্য প্রোথিত হয়েছিল, তা গতি সঞ্চার করেছিল চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে। ছাত্র-জনতার এ আন্দোলনের মুখে সেই সরকারের পতন ঘটেছে গত ৫ আগস্ট। পাশাপাশি রাষ্ট্র মেরামত ও সংস্কারের প্রত্যয় নিয়ে ৮ আগস্ট গঠন হয়েছে এক নতুন সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার। স্বাভাবিকভাবেই এ সরকারকে ঘিরে রয়েছে ব্যাপক জন-আকাঙ্ক্ষা। এর মধ্যে অন্যতম বৈষম্য দূর করে একটি সুষম রাষ্ট্র সৃজন। তাই হয়তো অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পর হেঁটেছে জনপ্রশাসন সংস্কারের পথে তথা ব্যাপক রদবদলের পথে। তাছাড়া বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার পেছনে এ মন্ত্রণালয়ের দায় কম ছিল না। তবে সমস্যা হলো, কাজটি অনেকটাই হঠকারী সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে করেছে এ সরকার।
বিগত সরকারের আমলের সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে যারা বঞ্চিত তাদের পদায়ন করা হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ পদে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর শীর্ষ পদে তাদেরই পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার সর্বশেষ রোববার সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পান ১১৯ জন। এর মধ্যে ৩৫ জনই প্রশাসন ক্যাডারে ৮২ নিয়মিত ব্যাচের সদস্য।
এর আগে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়ন ঘিরে সচিবালয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। দিনভর সচিবালয়ে হট্টগোল করেছেন বিভিন্ন ব্যাচের উপসচিবদের একাংশ। সে সময় জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়নে ২৪, ২৫ ও ২৭তম বিসিএস ব্যাচের কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি বলে জানা গেছে। আবার সদ্য নিয়োগকৃতদের অনেকের নিয়োগ একদিনের ব্যবধানে বাতিল করা হয় বা অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে বেশকিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। বিশেষ করে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে সুবিধাভোগী, বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্তরাও নিয়োগ পাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ ওঠে।
এ ধরনের ঘটনা মূলত গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছয় মাস পার হলেও এখনো সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত আন্দোলনে আহতরা। নানা দাবি নিয়ে প্রায়ই রাস্তায় নামছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। বেড়েই চলেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। নানা উদ্যোগ নিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মূল্যস্ফীতি। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি পণ্যে ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে চাপে পড়েছে ভোক্তা। বাড়ানো যায়নি কর্মসংস্থান। এমন পরিস্থিতিতে একটি পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেয়া জন-আকাঙ্ক্ষাকে খাটো করার শামিল। পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতার মূল্যায়ন না করে অন্য কোনো বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া বৈষম্যবিরোধী চেতনার সঙ্গে যায় না।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিসিএস ৮২ ব্যাচের নিয়োগ শুরু হয় ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে। দুই ধাপে পুরো নিয়োগ শেষ হয় ১৯৮৪ সালে। এ ব্যাচে মোট কর্মকর্তা ছিলেন ১৯১ জন। তাদের মধ্যে সচিব পদে নিয়োগ পাওয়া শুরু করেন ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। ধীরে ধীরে প্রশাসনে আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন এ ব্যাচের কর্মকর্তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা চার মেয়াদেই তারা নিজেদের এ প্রভাব ধরে রাখেন। আবার এ সরকার পতনের পরও নিজের অবস্থান ধরে রাখেন প্রশাসন ক্যাডারের নিয়মিত ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সর্বশেষ পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ ব্যাচের আধিপত্য বজায় রয়েছে।
এটি গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটে গঠিত সরকারের কাছ থেকে কাম্য নয়। যেকোনো পদে পদায়নের ক্ষেত্রে এ সরকারের আরো সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি ছিল। নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে নতুন করে বৈষম্য তৈরি হলে জন-আকাঙ্ক্ষার গণ-অভ্যুত্থান বিফল হয়ে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি কেবল বঞ্চিত দাবিতে কাউকে পদোন্নতি দেয়াও সমীচীন নয়। কারণ নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন। দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন না হলে তাতে কোনো সুফল আনা সম্ভব হয় না। উল্টো কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং বিশৃঙ্খলা আরো বাড়তে থাকে। তাই জনপ্রশাসনের মতো জায়গায় যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দেয়া হবে এবং ভারসাম্য বজায় রাখা হবে—সেটিই কাম্য। এটি যেহেতু সব সময়ই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, সরকারের উচিত সময় নিয়ে গভীর পর্যালোচনার মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া। সেই সঙ্গে সরকারের উচিত গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধরে রাখতে কাজ করা।
এক্ষেত্রে বরং অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন ছিল জনপ্রশাসনে গতি ফেরানো। এজন্য পতিত বিগত সরকারের সময়কার মতোই এখনো মাথাভারী প্রশাসন (যেখানে শীর্ষ পর্যায়ে অতিরিক্ত জনবল আর নিচের দিকের পদগুলোয় লোকবল ঘাটতি), পুরনো আমলাদের ওপর নির্ভরতা, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আধিক্য ও সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসার দরকার ছিল। এমন পরিস্থিতিতে জনপ্রশাসন সংস্কারে গঠিত কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে যেসব সুপারিশ প্রস্তাব করেছে তার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
আর এসব কারণে জনমনে যেসব প্রত্যাশা রয়েছে তা ক্রমে ম্লান হয়ে আসছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাসে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পারা সফলতা বলা যায়, তবে মানুষ খুব বেশি স্বস্তিতে নেই। এ সময় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা। দেশের অর্থনীতিতে গত ছয় মাসে গণমুখী কোনো সংস্কার ঘটেনি। বরং অভিযোগ উঠেছে বিগত সরকারের মতো দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নীতি পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) প্রেসক্রিপশন নির্ভর রয়ে গেছে। অর্থনীতিতে কিছুটা গতি এলেও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ কমায় কর্মসংস্থান বাড়েনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।
আবার অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল ব্যয়সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহার করে এ খাতের ব্যয় কমিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও গ্যাসের আমদানি, সরবরাহ সংকট, বকেয়া, ভর্তুকি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বরং বিগত সরকারের দেখানো পথে হেঁটে এ খাতে আরো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে করছেন জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিও ঘটেনি। ছয় মাসেও পুলিশ-র্যাবের কার্যক্রমে আশানুরূপ গতি আসেনি। অপরাধ দমন বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শক্ত ভূমিকা চোখে পড়ছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে খুন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে মোট ৫ হাজার ৮৬২টি, বরং ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ নানা অপরাধে জড়িত অনেকে জামিনে মুক্ত হয়। কারাগার থেকে বেরিয়ে তারা আবারো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শুরু করে। চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাতে জড়ায়।
আবার ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া দলগুলো এবং সরকার জাতীয় ঐকমত্যের কথা বললেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। সরকারের কাজে গতিহীনতার জন্য একাধিক উপদেষ্টাসহ অনেকেই দায়ী করছেন জনপ্রশাসনের স্থবিরতাকে। গত ছয় মাসে অন্তত দেড় শতাধিক আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয়েছে সরকারকে। যৌক্তিক-অযৌক্তিক দাবি নিয়ে সড়ক বন্ধ করে আন্দোলন সাধারণ মানুষকে ভোগালেও তা নিরসনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। জুলাই গণহত্যা ও আওয়ামী লীগ শাসনামলের অনিয়মের বিচারের গতি ধীর বলে অভিযোগ অভ্যুত্থানের অংশীজনের। রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ সংস্কারের গতিও ধীর।
সরকারের প্রয়োজন এসব দিকে নজর দেয়া, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সব ক্ষেত্রে, অর্থনীতির ক্ষত সারিয়ে তোলায়। বিগত সরকারের মতো বর্তমান সরকারের আমলেও বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠী গড়ে ওঠুক—এটি কখনই কাম্য নয়।










