প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে এআই, ডিজিটাল রূপান্তর এবং ডেটানির্ভর শিক্ষা দূরবর্তী কোনো ধারণা আর নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, গবেষণা, প্রশাসন ও শিল্প খাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাতেও এ পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এখন তথ্য বা জ্ঞান অনুসন্ধানের কাজ এআইয়ের কারণে অনেক সহজ হয়ে গেছে। ঘরে বসেই অনেক তথ্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

এআই সম্পর্কে মানুষের কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। এটি মানুষকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন আসলে করবে না। বরং যারা এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে তারাই অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হবে। আগে এমন অনেক কাজ ছিল যা করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে হতো। কিন্তু এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহযোগিতায় এসব অনেক কম সময়ে করা যাচ্ছে। প্রতিবেদন তৈরি, ভিডিও সম্পাদনা, কনটেন্ট তৈরি, আবেদনপত্র তৈরি, ব্যবসা পরিকল্পনা এমনকি মার্কেটিংয়ের কাজটিও সহজ হয়ে গেছে। বাণিজ্যে অনেক বড় পরিবর্তন এনেছে এআই। আগে ক্রেতা পরিষেবা দেয়ার জন্য সশরীরে কাউকে থাকতে হতো। কিন্তু এখন অনলাইনে এমন উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। এআই চালিত অনেক বটই মানুষকে দ্রুত উত্তর দিচ্ছে। কাস্টমার সার্ভিসের জন্য বট এখন অনেক স্থানে বিকল্প হয়ে উঠছে। শিল্প খাতেও অটোমেটেড মেশিনারি মানবশ্রমের পরিবর্তে আরো নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রেও এআই নতুন যুগের সূচনা করেছে। এখন প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাস, পরীক্ষা, ভার্চুয়াল শিখন, স্মার্ট ক্লাসরুম এমনকি এআই সহযোগিতার ভিত্তিতে শেখার পদ্ধতি জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), ডিজিটাল লাইব্রেরি, ব্লেন্ডেড লার্নিং এবং ভার্চুয়াল ল্যাবের ব্যবহারও শিক্ষাকে আরো সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করে তুলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহযোগিতা এবং একাডেমিক ডেটা বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীদের শেখার মধ্যে ফাঁক, তাদের একাডেমিক অবস্থা এমনকি ঝরে পড়ার ঝুঁকিও এখন পরিমাপ করা যাচ্ছে।

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এআই রূপান্তরের বড় শক্তি হতে পারে। এজন্য আধুনিক ল্যাব সুবিধা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠক্রম চালু করা গেলে আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন জ্ঞান তৈরি ও উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়বে। তবে এআই প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি অনেক প্রতিবন্ধকতাও আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের অপপ্রচার এমনকি কারো ব্যক্তিগত সৃজনশীলতাকে চুরি করার মতো গুরুতর অভিযোগ আছে। আবার ব্যক্তির অনলাইনে প্রাইভেসির ক্ষেত্রেও অনেক ঝুঁকি আছে। এগুলো প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে ঘটছে।

এআই আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষার বিষয়টিকে তাই গুরুত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে নির্দিষ্ট বয়স না হলে প্রবেশাধিকার মেলে না। এজন্য নীতিমালাও তৈরি করা হচ্ছে। আবার তথ্যের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক ডেটা এবং গবেষণার তথ্য সংরক্ষণ করতে হয়। এজন্য নিরাপদ সার্ভার, সাইবার সচেতনতা ও ডেটার সুরক্ষার জন্য ব্যবস্থা রাখতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের স্বার্থে বাংলাদেশকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়েও সবাইকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা, গবেষণা পরিবেশ বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে টেকসই করার জন্য শিল্প সংযুক্ততা বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তর শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়। এটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় প্রস্তুত হওয়ার পথনকশা। প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে পারলে এর সম্ভাবনা ব্যাপক।

কেবিএম মঈন উদ্দিন চিশতী: ভাইস চেয়ারম্যান

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি); সাবেক চেয়ারম্যান, ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পিএলসি