এমনকি ডেঙ্গুর বিস্তার ও লক্ষণেও এসেছে বড় পরিবর্তন। যে কারণে একসময় কেবল বর্ষা বা শহুরে রোগ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ডেঙ্গুতে বর্তমানে বছরব্যাপী মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে।
দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয় ২০২৩ সালে। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। এর পরের দুই বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কিছুটা কমলেও সেই মাত্রাও ছিল উদ্বেগের। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। এ সময় যথাক্রমে ৫৭৫ ও ৪১২ জনের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়। চলতি বছরের শুরুতে সংক্রমণ কমে এলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ মে পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং এরই মধ্যে পাঁচজন মারা যাওয়ার তথ্য মিলেছে। আক্রান্তের হার বেশি বরিশালে, যা গত বছরও দেখা গেছে। সামনে দেশব্যাপী ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকার যদি অনতিবিলম্বে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারে, তবে এ আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে দেরি নেই।
ঈদুল আজহার আগে টানা বৃষ্টির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। আর বৃষ্টির জমা পানি এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এদিকে ঈদের দীর্ঘ ছুটি শেষে রাজধানীতে ফিরে অনেকেই অজান্তে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। একই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ এবং নির্মাণাধীন স্থাপনার অনিয়ম সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
এদিকে ঈদের ছুটি শেষ করে এরই মধ্যে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। রাজধানীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতির যেন অবনতি না ঘটে, তাই সরকারকে দ্রুত এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি দেশব্যাপী ডেঙ্গুর হটস্পট ও আশপাশের এলাকার মানুষের সুরক্ষায় ডেঙ্গু প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। নয়তো এবারো ডেঙ্গু সংক্রমণ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা মোটেও কাম্য নয়। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে মানুষের আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বমুখী থাকাটা মোটা দাগে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতারই প্রতিফলন। আর এ অব্যবস্থাপনার দায় কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় না। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সবার দায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল আচরণ ও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনমন ঘটে চলেছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এখনো এটিকে মৌসুমি ধারার সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে সংক্রমণ বাড়ার পরপর নানা তৎপরতা দেখা যায়, কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই খুব বেশি ফলপ্রসূ হয় না। আবার কোনোভাবে সংক্রমণ কমে এলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে পরবর্তী সময়ে সংক্রমণের হার বেড়ে যায়। অথচ ডেঙ্গু মোকাবেলায় প্রয়োজন বছরব্যাপী নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। বিশেষ করে যেসব এলাকায় প্রতি বছর সংক্রমণের হার বেশি থাকে, সেসব এলাকাকে কেন্দ্র করে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত লার্ভা জরিপ এবং প্রজননস্থল ধ্বংসে স্থানীয় প্রশাসনকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
একই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এডিস মশার বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তাই ডেঙ্গুকে কেবল স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তাই এটি স্থানীয় সরকার, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সচেতনতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সার্বিকভাবে নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়।
আবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়ে গেলে স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতার দিকটিও উন্মোচিত হয়ে পড়ে। হাসপাতালে শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে মেঝেতে ঠাঁই নিতে হয় বাড়তি রোগীদের। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে চিকিৎসা ক্ষেত্রেও কিছু প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন। ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় শয্যা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা, স্যালাইন ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা জোরদার করা জরুরি। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডেঙ্গুর বিস্তার রাজধানীর বাইরে বেশি দেখা গেছে।
এগুলোর বাইরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা তৈরি। মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে কোথাও যাতে তিনদিনের বেশি পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য গণসচেতনতামূলক প্রচারণাকে ধারাবাহিক কর্মসূচিতে পরিণত করা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু বাংলাদেশের জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ কম। প্রতি বছর একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দেশবাসী যাবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন আগাম পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল এবং কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারকে এগুলোর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে একটি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টেকসই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে সেটাই প্রত্যাশা।










