একটা সময় ছিল যখন অর্থনীতির পাঠ্য যেকোনো বইতে চোখ বোলালেই একটা কথা উঠে আসত—‘নিম্নস্তর ভারসাম্যের ফাঁদ’। ধারণাটি চল্লিশের দশকের, যখন পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশই ছিল নিম্ন আয়ের অর্থনীতি এবং তাদের বলা হতো ‘অনুন্নত বিশ্ব’। ১৯৪৩ সালে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ‘জোর প্রচেষ্টা’ তত্ত্বের প্রবক্তা বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ রোডেনস্টাইন-রোডান বলেছিলেন, যেসব অর্থনীতির হোতারা তাদের উদ্যোগকে সমন্বিত করতে পারেন না, সেসব অর্থনীতি আসলে ভারসাম্যের একটি নিম্নস্তরের ফাঁদে আটকা পড়ে যায়।
সময় বদলে গেছে এবং নিকটবর্তী অতীতে পুরো আলোচনাটি সরে গিয়ে স্থিত হয়েছে সেখানে, যাকে বলা হচ্ছে ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদ’। গত তিন দশকে নিম্ন আয়ের স্তর থেকে বহু উন্নয়নশীল দেশের উত্তরণ ঘটেছে, তাদের দারিদ্র্যের আপাতন হ্রাস পেয়েছে এবং এগিয়ে গেছে তাদের মানব উন্নয়ন। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা জেগেছিল যে মধ্যম আয় স্তর থেকে শিগগিরই এসব দেশের উত্তরণ ঘটবে উচ্চ আয় স্তরে। বাস্তবে কিন্তু সেটা ঘটেনি এবং এসব দেশ আটকে থেকেছে একটি ‘মধ্যম আয় ফাঁদে’। এ ফাঁদটি তৈরি হয় তখনই, যখন একটি নিম্ন আয়ের দেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে নিম্ন আয় স্তর থেকে মধ্যম আয় স্তরে প্রবেশ করে, কিন্তু তারপর উচ্চ আয়স্তরে প্রবেশ করতে দেশটিকে বেগ পেত হয় এবং সেই উত্তরণটি আর ঘটে না।
আয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের দেশগুলো তিন ভাগে বিভক্ত: নিম্ন আয়ের দেশ, মধ্যম আয়ের দেশ ও উচ্চ আয়ের দেশ। মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে আবার আর একটি বিভাজন আছে, নিম্নতর মধ্যম আয়ের দেশ এবং উচ্চতর মধ্যম আয়ের দেশ। বিশ্বব্যাংকের ভাষ্যমতে, যদি বর্তমানে একটি দেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ১৪৫ ডলারের কম হয়, তাহলে দশটি নিম্ন আয়ের দেশ। একটি নিম্নতর মধ্যম আয়ের দেশের জন্য সে আয় হবে ১ হাজার ১৪৬ ডলার থেকে ৪ হাজার ৫১৫ ডলার পর্যন্ত। সেই আয় যদি ৪ হাজার ৫১৬ ডলার থেকে ১৪ হাজার ৫ ডলারের মধ্যে থাকে তাহলে দেশটি উচ্চতর মধ্যম আয়ের দেশ। মাথাপিছু আয় ১৪ হাজার ৫ ডলারের বেশি হলে দেশটি উচ্চ আয়ের দেশ।
বর্তমান সময়ে ব্রাজিল, চীন, তুরস্ক, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোসহ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে আছে। এসব দেশের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে আগামী দু-তিন দশকের মধ্যে উচ্চ আয় স্তরে স্থানান্তরিত হওয়া। কিন্তু তাদের সে লক্ষ্যের সঙ্গে তাদের অর্জিত উন্নয়নের পার্থক্য বড় স্পষ্ট। ১৯৯০ সাল থেকে হালতক মাত্র ৩৫টি মধ্যম আয়ের দেশের উত্তরণ ঘটেছে মধ্য থেকে উচ্চ আয়ের স্তরে। এ ৩৫টি দেশের মোট জনসংখ্যা ২৫ কোটির মতো—পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার সমান। আজ মধ্য আয় স্তরে যতগুলো দেশ আছে তাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ছয়শ কোটি। সময়ের বিপরীতে একটি লড়াইয়ে তারা লিপ্ত। উচ্চ আয় স্তরে উত্তরণের পথে বহু মধ্যম আয়ের দেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকা পড়ে আছে, যে ফাঁদকে কখনো কখনো ‘মধ্যম আয়ের অভিশাপ’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়। আসলে কোনো কোনো মধ্যম আয়ের দেশের মাথাপিছু আয় ৮ হাজার ডলার পর্যন্ত উন্নীত হওয়ার পর তাদের গতিত্বরণ শ্লথ হয়ে এসেছে, অগ্রযাত্রা থমকে গেছে এবং তাদের সে পথযাত্রায় একটি স্থবিরতা এসেছে।
মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে যাওয়ার একাধিক কারণ থাকে। একটি কারণ হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিপুল ঋণভার। যেমন গত বছর উন্নয়নশীল বিশ্ব তাদের মোট ঋণের ওপর ১ দশমিক ৪ লাখ কোটি ডলার শুধু সুদ হিসেবে দিয়েছে। দরিদ্রতম দেশগুলো দিয়েছে ৯৬০ কোটি ডলার। দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যায় বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক বৃদ্ধি। বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশই বৃদ্ধ এবং তার দুই-তৃতীয়াংশই উন্নয়নশীল বিশ্বে বাস করে। বিভিন্ন কারণে এ ব্যাপার উচ্চ আয়ে যাওয়ার পথে একটি প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। তৃতীয়ত, উচ্চ আয়ের স্তরে যাওয়ার জন্য মধ্যম আয়ের দেশগুলোর একটি বড় বাধা হচ্ছে উন্নয়ন বিশ্বের বিরুদ্ধে উন্নত বিশ্বের প্রতিবন্ধকতামূলক বাণিজ্যনীতি। উন্নত দেশগুলো মধ্যম আয়ের দেশগুলোর রফতানির বিরুদ্ধে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে এবং সেই সঙ্গে শুল্ক-বহির্ভূত প্রতিবন্ধকতাও দাঁড় করায়। চতুর্থত, কোনো কোনো মধ্যম আয়ের দেশ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বড় বেশি নির্ভরশীল। শেষত, স্থবির প্রবৃদ্ধিও উচ্চ আয়ের স্তরে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন থাইল্যান্ড। এসব কারণ সম্মিলিতভাবে মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে রেখেছে।
প্রায়ই যুক্তি দেখানো হয় যে মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্যে দুই ধাপের উত্তরণ প্রয়োজন হবে। এক. বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার কৌশল থেকে এমন এক কৌশলে উত্তরণ, যেখানে বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে অনুপ্রবিষ্টতাকে গুরুত্ব দেয়া হবে। সে অনুপ্রবিষ্টতার মূল লক্ষ্য হবে বহির্বিশ্ব থেকে প্রযুক্তি নিয়ে এসে স্থানীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে দেয়া। দ্বিতীয় উত্তরণে এমন একটি কৌশল প্রয়োগ করতে হবে, যেখানে বিনিয়োগ ও অনুপ্রবিষ্টতার সঙ্গে উদ্ভাবনকেও যুক্ত করা হবে। মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যেও বিভিন্ন দেশের নিজস্ব পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিটি দেশকে ধাপে ধাপে ক্রমানুসারে আরো পরিশীলিত নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। যেমন নিম্নতর মধ্যম আয়ের দেশগুলোর উচিত হবে বিনিয়োগ এবং অনুপ্রবিষ্টতা মিশ্রতার কৌশল গ্রহণ করা এবং উচ্চতর মধ্যম আয়ের দেশগুলোর উচিত হবে বিনিয়োগ, অনুপ্রবিষ্টতা ও উদ্ভাবনের যূথবদ্ধ কৌশলটি গ্রহণ করা।
প্রামাণিক তথ্য থেকে দেখা যায়, যেসব দেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, তারা নিম্নোক্ত কাজগুলো করেছে। এক. নতুন সব ক্ষমতাবান উদ্যোক্তাকে একটি শৃঙ্খলাবলয়ে আসার জন্য উৎসাহ দিয়েছে। দুই. মেধাকে পুরস্কৃত করে প্রভিতার প্রসার ঘটানো হয়েছে। তিন. সংকটকালকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে নীতিমালা এবং প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করা হয়েছে। এতদ্ব্যতীত এসব দেশ ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে প্রসারিত করেছে, উন্মুক্ত ও তথ্যভিত্তিক বিতর্ককে উৎসাহিত করেছে এবং সেই সঙ্গে প্রয়োজনমতো ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি পরিবর্তন করার মতো রাজনৈতিক সৎসাহস দেখিয়েছে।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নতর মধ্যম আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে। গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ দেশ অনেকটা নিজের অজান্তেই মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ে গেছে। এ প্রক্রিয়ায় ছয়টি উপসর্গকে চিহ্নিত করা হয়েছে—উৎপাদন ও কর্মনিয়োজনের মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক—ফলাফল কর্মশূন্য প্রবৃদ্ধি; দেশের শিল্প খাতের স্থবিরতা ও সংকোচন; জাতীয় আয়ে রফতানি খাতের অপর্যাপ্ত অবদান; বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ স্থবিরতা; স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অপ্রতুল বিনিয়োগ এবং সুশাসনের অভাব। সেই সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কারের অনুপস্থিতি, কৃত সংস্কারকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, বৈশ্বিক দুর্যোগ এবং বাস্তব অবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ধারণার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফারাক এ অবস্থার আরো অবনতি ঘটিয়েছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কারণের মধ্যে ছিল নিম্ন উৎপাদনশীল কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে বেশির ভাগ কর্মনিয়োজনের কেন্দ্রীভূতকরণ, সর্বত্র সম্পদের কু-বরাদ্দ এবং অর্থনীতির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের বিচ্যুতি। এর পাশাপাশি সরকারি উপাত্তকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করার ফলে বাংলাদেশ অর্থনীতির পথযাত্রার একটি বিভ্রান্তমূলক চিত্রই আমরা পেয়েছি।
ইদানীং সময়ে বাংলাদেশের জন্যে মধ্যম আয় ফাঁদ বিষয়টি একটি আরো বেশি গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বাংলাদেশ অর্থনীতি বর্তমানে একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট, নিম্ন বেসরকারি বিনিয়োগ, উচ্চ বেকারত্ব—বিশেষত তরুণ সমাজের মধ্যে—একটি শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে বাংলাদেশকে এ ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে কাঠামোগত পরিবর্তন, নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। এর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ ওই ফাঁদে আটকাই পড়ে থাকবে।
সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক. মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র










