জীববৈচিত্র্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বন্যপ্রাণী। ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সবুজে ঘেরা, ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে অসংখ্য বন্যপ্রাণী বিচরণ করে এ দেশে। তবে বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে এর সংখ্যা ক্রমেই কমছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়সহ মানুষের নানা অবিবেচিত কর্মকাণ্ডে সৃষ্টি হয়েছে বন্যপ্রাণীর বাসস্থান ও খাদ্য সংকট। ফলে দিন দিন বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গত সোমবার বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস পালিত হয়েছে। বন তথা আবাস উজাড়, চোরা শিকার ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মতো বিভিন্ন কারণে প্রতি বছর পৃথিবী থেকে কোনো না কোনো বন্যপ্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হচ্ছে বা বিলুপ্তির মুখে পড়ছে। বিলুপ্তপ্রায় এসব প্রাণী রক্ষা করতেই বিশ্বে প্রতি বছর ৩ মার্চ বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস পালন করা হয়। বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অর্থায়ন, মানুষ ও ধরিত্রীর উন্নয়ন’। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৩১। আইইউসিএনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে ৩৯০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী কোনো না কোনোভাবে বিপদাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এ প্রজাতিগুলোকে আইইউসিএন লাল তালিকাভুক্ত করেছে।

জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আধার সুন্দরবন। এখানে জলজ, প্রাণিজ ও বনজ সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম লবণাক্ত বনাঞ্চল (ম্যানগ্রোভ বন) হওয়ার পাশাপাশি এ বনের রয়েছে বিশাল জলাকীর্ণ অঞ্চল, যার পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ সমগ্র বনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ জলাভূমি। প্রায় ৪৫০টি নদী-খাল জালের মতো ছড়িয়ে আছে এ বনে। বলা যায়, বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা সুন্দরবনকে বৈচিত্র্যময় করেছে উজানের জলপ্রবাহ, লবণাক্ত সামুদ্রিক স্রোতধারা ও কাদা চর। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি সেসব প্রাকৃতিক সম্পদ অবদান রাখে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখতে। ‘সুন্দরবন সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ বনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কমপক্ষে ৩৫ লাখ মানুষ নির্ভরশীল। এছাড়া সরকার প্রতি বছর এ বন থেকে মোট বনজ রাজস্বের ৪১ শতাংশ আহরণ করে এবং উপকূলীয় এলাকার মানুষের জ্বালানি কাঠ সরবরাহ করে। কিন্তু সম্প্রতি সুন্দরবন বিধৌত নদীগুলোর নাব্য সংকট, নদী ভরাট ও দখল, বিরূপ জলবায়ু এবং অসচেতনতার ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ প্রাকৃতিক সম্পদ সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ভোলা, খড়মা ও আড়ুয়ারবেড় নদীর নাব্য সংকট সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি সংকট তৈরি করেছে অববাহিকার কৃষি উৎপাদনেও। এ থেকে আশঙ্কা করা যায় যে উদ্ভূত সংকটগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশ ও দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দেশের বন অধিদপ্তর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করে। ১৯৭৩ সালের বন্যপ্রাণী আইন সংশোধন করে ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটও গঠন করা হয়। যেভাবে বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে, এতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বন অধিদপ্তরের গৃহীত প্রকল্পগুলো ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। যেকোনো কাজে সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ যদি সহযোগী না হয় তাহলে কেবল আইন প্রণয়ন করে কিংবা প্রয়োগ করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা যাবে না। এক্ষেত্রে বন অধিদপ্তর ও মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে।

বনায়ন এবং এর পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডের ফলে যেসব বনভূমি আছে, সেগুলো আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সুন্দরবনের কথা। সুন্দরবন অঞ্চলের নদী দখল ও ভরাটের ফলে সুন্দরবন বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন। অতিরিক্ত বনজ সম্পদ আহরণ এর পেছনে দায়ী। বন ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই বন্যপ্রাণীর জীবন সংকটে পড়ে। একদিকে আবাসন সংকট বাড়ে, অন্যদিকে দেখা দেয় খাদ্য সংকট। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ বনে ঢুকে প্রাণী শিকার করে, এমনকি পাচার করে। আবার অনেক সময় বন্যপ্রাণী লোকালয়ে প্রবেশ করলে মানুষ হতাহত হয় কিংবা মানুষকে বাঁচাতে প্রাণ হারাতে হয় ওই প্রাণীকে। এ দুটির কোনোটিই আসলে কাম্য নয়।

সরকারি হিসাবে, বর্তমানে দেশে মোট আয়তনের ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ এলাকায় বনভূমি রয়েছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় বিশ্বের সব দেশকে বনভূমির পরিমাণ ৩০ শতাংশ করার লক্ষ্য বেঁধে দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে বনভূমির পরিমাণ ১৬ শতাংশ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সুতরাং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে আশা করা যায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বাড়বে। তবে এখানেও মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমেও বনায়ন তৈরি করে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বাড়ানো সম্ভব। বিভিন্ন দেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠছে বনভূমি। দেশে এ ধরনের চর্চাকে উৎসাহ দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবে কেবল বনায়ন করলেই হবে না, বন পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো তা বন্যপ্রাণীর বাস উপযোগী হবে না।

বন্যপ্রাণী নিধনের ক্ষেত্রে আইনের কঠোরতা আরোপ করে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সাধারণ মানুষ সচেতন হলে বন্যপ্রাণী রক্ষা করার কাজটি সহজ হতে পারে। তাই মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে। সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অসাধু বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ীদের ঠেকাতে হবে। বন্যপ্রাণী পাচার রোধে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটকে সক্রিয় হতে হবে। বন্যপ্রাণী বাঁচাতে হলে তাদের আবাসন সংকট দূর করে নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে হবে এবং খাদ্যের জোগান বাড়াতে হবে। এটি কেবল সরকারি উদ্যোগে সম্ভবপর হবে না। এক্ষেত্রে বন অধিদপ্তর ও জনগণের সহযোগী হয়ে কাজ করা জরুরি। উভয়ে তৎপর হলে বিলুপ্তির পথে থাকা বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করা যাবে বলে আশা করা যায়।