দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ব্যাংক খাত। যদিও অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন, পরিবার বা গোষ্ঠীতন্ত্রের প্রভাবে বর্তমানে খাতটি ভঙ্গুরপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপরও এর দায় বর্তায়। কেননা বিগত বছরগুলোয় অনেক ঘটনা চিহ্নিত হওয়ার পরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি বাংলাদেশ ব্যাংককে। ফলে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে ব্যাংকগুলোয়। এতে গ্রাহকের আস্থা কমেছে এ খাতে।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ, পরিবীক্ষণ আরো সুদৃঢ় করা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর জনমনে প্রত্যাশা ছিল, বিগত সরকারের আমলে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা সেরে উঠবে শৃঙ্খলা ও সুশাসনের মাধ্যমে। এ প্রত্যাশা এখন নেই তা নয়, তবে পূরণের সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে আসে যখন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান ব্যাংকগুলোয় গণপদোন্নতির ঘটনা ঘটে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান চার ব্যাংকে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। এর মধ্যে ৭ হাজার ২১৫ জনই পদোন্নতি পেয়েছেন সুপার নিউমারারি (পদ ছাড়াই পদায়ন) ভিত্তিতে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকের অর্গানোগ্রাম বা জনবল কাঠামো ভঙ্গ করে এমন গণপদোন্নতির নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন আরো জানাচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান চার ব্যাংকের প্রতি চারজনের একজন গত ২০ দিনে পদোন্নতি পেয়েছেন।

এ থেকে প্রতীয়মান হয়, যেন শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বদলে ব্যাংকগুলো আরো বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে। গণপদোন্নতির ফলে ব্যাংকগুলোয় অবকাঠামোগত সংকট বাড়ছে। পদ না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কক্ষ ও চেয়ার-টেবিল দিতেই ব্যাংকগুলো এখন হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেছনে এ ব্যাংকগুলোর ব্যয় বাড়বে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকগুলোয় রয়েছে ব্যাপক মূলধন ও সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি। আবার এগুলো খেলাপি ঋণেও জর্জরিত। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় অর্ধেকই বর্তমানে খেলাপি। এগুলোর খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকায়। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে পদোন্নতির বিষয়টি বেশ হতাশাব্যঞ্জক। বিশেষত যখন এ গণপদোন্নতির প্রভাব অন্য ব্যাংকগুলোর ওপরও পড়ছে।

এরই মধ্যে একাধিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা সুপার নিউমারারি ভিত্তিতে পদোন্নতির দাবি তুলেছেন। এমনকি দাবি আদায়ে কর্মকর্তারা পরিচালনা পর্ষদকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা সভা-সমাবেশ করছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকর্তাদের দাবির বিষয়টি জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠিয়েছে ব্যাংকগুলোর পর্ষদ।

এদিকে গণপদোন্নতি দেয়ার বিষয়ে ওই ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পরিচালকদের মত, নতুন উদ্যমে কাজ করবেন দীর্ঘদিন বঞ্চিত থেকে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা। কিন্তু যেখানে ব্যাংকের সামর্থ্য সন্দিহান, সেখানে পদোন্নতি আরো বিশৃঙ্খলা ও চাপ বাড়াবে বলেই আশঙ্কা রয়েছে। আবার এখানেও পদোন্নতির বিষয়ে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া এ গণপদোন্নতি মোটেও স্বাভাবিক নিয়মে হয়নি। পদোন্নতি নিয়ে সচিবালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার প্রভাবই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এসে পড়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি না পাওয়া সব কর্মকর্তাই নিজেকে বৈষম্যের শিকার বলে দাবি তুলেছেন এবং ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এক ধরনের জিম্মি করে গণপদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের দুর্বলতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতার প্রভাবও এক্ষেত্রে কাজ করেছে।

ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এমন পদোন্নতি ও পদোন্নতির দাবির যে হিড়িক উঠেছে তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। তাই সংস্কারের মূল প্রতিপাদ্য হওয়া দরকার ‘শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা’। নয়তো বিগত সরকারের আমলে যে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম ব্যাংক খাতকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে, তা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোয় যে সংকট বিরাজ করছে তা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা পুঞ্জীভূত হতে হতে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব সংকটগুলোকে প্রকট করেছে। বিগত সময়ে ব্যাংকের যে ভালো চর্চাগুলো ছিল সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। তাই বর্তমান সরকারকে ভালো চর্চাগুলোকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করায় মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। ব্যাংক খাতে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে আইনের কার্যকর প্রয়োগ থাকবে। আইন-শৃঙ্খলা না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানই ভালো ফল দেয় না। কেননা এর আগেও বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেগুলোর ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। বরং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং আইনের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে প্রভাবশালী ও ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সর্বেসর্বা হয়ে দুর্নীতি ও লুটপাট করেছেন। তাই সুশাসন নিশ্চিত করা আবশ্যক। যেকোনো ধরনের চাপ থেকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে মুক্ত রাখতে হবে। এজন্য আবার শীর্ষ পদগুলোয় দায়িত্বশীল, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তির পদায়নও জরুরি। একই কথা প্রযোজ্য পদোন্নতির বিষয়েও। এভাবে গণপদোন্নতি দিয়ে, বিশেষ করে পদ না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দিয়ে ব্যাংক খাতকে আরো অস্থিতিশীল করে তোলা একদমই সমীচীন হবে না। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

তাছাড়া ব্যাংক খাতের ক্ষত সারিয়ে তুলতে এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কারণ সুশাসন ছাড়া ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে না। আর আস্থা ছাড়া অর্থনৈতিক সংকটের সময় জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়, যার ফল হিসেবে ব্যাংক খাতে আমানত কমতে দেখেছি আমরা। সুতরাং দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে ব্যাংকে শৃঙ্খলা-সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জোর ‍দিতে হবে।