এ বিজয় কেবল একটি দলীয় সাফল্য নয়, এটি জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, আস্থা ও আকাঙ্ক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। দেশের সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও ব্যাপক সমর্থনের মধ্য দিয়ে জনগণ বিএনপির হাতে তুলে দিয়েছে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব। এ বিজয় যেমন আনন্দের, তেমনি দায়িত্বেরও। এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে জনগণ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা একটি নতুন বাংলাদেশ চায়; যেখানে থাকবে গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন উন্নয়নের নিশ্চয়তা।

এ নতুন প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। তার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা সুদৃঢ়। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, নির্বাসিত জীবন এবং প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যেও তিনি যে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাকে সমসাময়িক রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তারেক রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নিয়ে সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন এক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন, যার লক্ষ্য একটি আত্মমর্যাদাশীল, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যার লক্ষ্য সবার আগে বাংলাদেশ।

জনগণের প্রত্যাশিত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে রয়েছে বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে অসম্ভব নয়। কারণ স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত ও তথাকথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে চিহ্নিত বাংলাদেশ আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা প্রমাণ করে যে সঠিক নেতৃত্ব থাকলে জাতির ভাগ্য বদলানো সম্ভব। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের অগ্রযাত্রার পেছনে বিএনপির অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন, কৃষি ও শিল্প খাতে সংস্কার এবং জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের ভিত গড়ে তুলেছিলেন। একইভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে অবকাঠামো, শিক্ষা ও শিল্পায়নে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল, তা আজও স্মরণীয়। উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতার উত্তরাধিকার বহন করছেন তারেক রহমান। আর সে কারণেই তার নেতৃত্বের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা আজ অনেক বেশি।

জনগণের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আর এ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো দেশের বাণিজ্য ও শিল্প খাত। বিশেষ করে রফতানিমুখী পোশাক শিল্প, যেখান থেকে বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ৮৩ শতাংশেরও বেশি অর্জিত হয়। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ খাতের ভূমিকা অপরিসীম।

তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছিলেন যে দেশকে নিয়ে তার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা মনে করি এ বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; এটি তার চিন্তার গভীরতা ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পোশাক শিল্পের উন্নয়নে তার বাস্তবভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো জ্বালানি সংকট পোশাক শিল্পের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত। একদিকে সরবরাহে ঘাটতি এবং অন্যদিকে বারবার গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি উৎপাদন সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে অনেক কারখানা বিশেষ করে টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অথচ মেনমেইড ফাইবারে আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। অথচ জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন টেক্সটাইল কারখানায় বিনিয়োগ হয়নি। বরং বিদ্যমান অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এ সমস্যার টেকসই সমাধানে শিল্প খাতভিত্তিক গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার, নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান, জ্বালানি আমদানি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা জরুরি। পাশাপাশি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জির দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।

পোশাক শিল্প ১০০ বিলিয়ন ডলার রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের রফতানির আকার ও পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। রফতানি বাড়লেও বন্দরের সক্ষমতা সে অনুপাতে না বাড়ায় শিল্প চাপের মুখে পড়ছে। আমাদের বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে সাম্প্রতিক সময়ে বন্দরের চার্জ বৃদ্ধি করার উদ্যোগ শিল্পকে উদ্বিগ্ন করেছে। চার্জ বৃদ্ধি নয়, বরং সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং দ্রুততম সময়ে পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বন্দর ব্যবস্থাপনায় জরুরি ভিত্তিতে যুগোপযোগী সংস্কার আনতে হবে। বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং অবশ্যই সব ধরনের জটিলতা দূর করে দ্রুততম সময়ে পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণ করার জন্য সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের সমুদ্রবন্দর অবকাঠামোর অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো পর্যাপ্ত নাব্যতার অভাব। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরে বড় আকারের মাদার ভেসেল বা বৃহৎ বাণিজ্যিক জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারে না। কারণ এ ধরনের জাহাজের নিরাপদে নোঙর করার জন্য প্রায় ১৩ ফুট বা তারও বেশি গভীরতা প্রয়োজন, যেখানে আমাদের বন্দরের গড় গভীরতা প্রায় ৭ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর ফলে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে ছোট লাইটার জাহাজের মাধ্যমে বন্দরে আনতে হয়। এ অতিরিক্ত ধাপ একদিকে যেমন সময় বাড়ায়, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। ফলস্বরূপ রফতানি-আমদানি প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়। বিশ্বের অনেক দেশ এরই মধ্যে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে বন্দরের সঙ্গে ১৩ ফুট গভীর টানেল বা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে। আমাদেরও এ পথে দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।

তাছাড়া কাস্টমস বন্ড-সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পাদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে পোশাক খাতে রফতানি কার্যক্রম প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সময়মতো পণ্য খালাস করা সম্ভব হয় না। কাজেই ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকে সহজতর ও দ্রুততর করতে হবে। কারণ তৈরি পোশাক শিল্প অত্যন্ত সময়সংবেদনশীল একটি খাত। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই উৎপাদন সম্পন্ন করে পণ্য রফতানি করতে হয়। কোনো কারণে যদি সময়মতো বিদেশী ক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহ করা না যায়, তবে রফতানিকারকরা তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্ডার হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়। কর, বন্দর ও শুল্ক-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে উৎপাদন ব্যয় ও সময় বেড়ে যায়, যা শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই ব্যবসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। আমরা আশা করি, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এ ব্যাপারে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। সহজ ঋণপ্রাপ্তির অভাব, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ এবং কাস্টমস জটিলতা তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং সহায়ক নীতি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বৃহৎ শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাও অপরিহার্য।

আমরা জানি বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে। এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি এটি নতুন চ্যালেঞ্জও বয়ে আনছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ)’ সুবিধা হারানোর ফলে বড় বাজারগুলোতে উচ্চ শুল্কের মুখে পড়তে হবে। এ প্রেক্ষাপটে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) ও অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) মতো উদ্যোগে কৌশলগতভাবে এগোতে হবে, যাতে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।

সাম্প্রতিক শ্রম আইন সংশোধনের কিছু বিধান শিল্পমহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশের বাস্তবতা ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে এসব বিষয় পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টি না হয় এবং উৎপাদন ব্যাহত না হয়।

এই মুহূর্তে সরকারের কাছে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সবার প্রত্যাশা। জাতীয় স্বার্থে অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার একটি স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পোশাক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বেড়েছে, যা ভবিষ্যতে রফতানি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

তবে শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ব্যবসাবান্ধব স্থিতিশীল নীতিসহায়তা। প্রয়োজন যুগোপযোগী, বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিকাঠামো প্রণয়ন।

আশিকুর রহমান তুহিন: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ।