জনগণের ঘাম, শ্রম আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত প্রতিটি রক্তাভ মুদ্রা আজ ক্ষমতার নিষ্ঠুর দাবার বোর্ডে কেবল একেকটি নির্বাক ঘুঁটি। যে অর্থের মর্যাদা রক্ষা করার কথা ছিল, সেই অর্থকেই আজ বারবার ক্ষমতার সিঁড়ি বানিয়ে নির্লজ্জভাবে নির্দ্বিধায় আরোহণ করা হচ্ছে। এ নিদারুণ পরিহাসের শেষ কোথায়, যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীকটি আজ কেবল কয়েক বছর পর পর বদলে যাওয়া রঙিন কাগজের টুকরোয় পরিণত হয়েছে?
বাংলাদেশের রাজনীতির এ টালমাটাল আবর্তে টাকার যে রূপান্তর আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ১৫টি কারণ বিশ্লেষণ করলে এক গভীরভাবে উদ্বেগজনক সত্য উন্মোচিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২৪ সালের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন জানায়, এ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং ক্ষমতার দম্ভ এবং পূর্ববর্তী শাসনের সব চিহ্ন মুছে ফেলার এক অদম্য রাজনৈতিক বাসনা। এ প্রতিবেদন স্পষ্ট করে যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বা আর্থিক প্রগতির চেয়ে রাজনৈতিক আধিপত্য জাহির করতেই নতুন নোট ছাপানোকে সচেতনভাবে একটি কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। এর অনিবার্য পরিণতিতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে টাকার যে ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক মর্যাদা, তা ক্ষয়ে গিয়ে ক্রমে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর প্রচারণামূলক হাতিয়ারে রূপ নিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ প্রবণতা জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নিঃশব্দে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।
টাকার এ নিরন্তর পরিবর্তনের ফলে সাধারণ মানুষ যে ৩০টি মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, তা বর্ণনা করতে গেলে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা হাহাকার ফুটে ওঠে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০২৫ সালের বিশেষ গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, দেশের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং বয়স্করা, নতুন নোটের নিরাপত্তা চিহ্ন চিনতে না পেরে প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ গবেষণার তথ্য আমাদের ধারণা দেয় যে বারবার নকশা বদলানোর ফলে মানুষের মনে মুদ্রার প্রতি যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা সঞ্চয়ের প্রবণতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয় এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে না কখন কোন রাজনৈতিক ইচ্ছায় তাদের হাতে থাকা টাকাটি মূল্যহীন বা অচল ঘোষণা করা হতে পারে।
মুদ্রার গুণগত মান বৃদ্ধি না করে কেবল তার বহিরাঙ্গন পরিবর্তনের এ প্রবণতা বাজারকে কতটা অস্থিতিশীল করছে, তার পেছনে ৫০টি গভীর কারণ আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২৪ সালের এক নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, নতুন নোট ছাপানোর এ বিশাল ব্যয় সরাসরি জাতীয় বাজেটের ঘাটতি বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে টাকার মানকে আরো বিকারগ্রস্ত করে তুলছে। এ পর্যবেক্ষণটি আমাদের নির্দেশ করে যে যখন একটি দেশ তার মুদ্রার বাহ্যিক চাকচিক্য নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে, তখন মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলার সংকটের মতো প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের রান্নাঘরের বাজারে; মানুষ বেশি টাকা দিয়ে কম পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে একটি কৃত্রিম অভাবের জন্ম দিচ্ছে এবং সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে ফেলছে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো মানুষ একটি নোটের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আগেই বাজারে আরেকটি নতুন টাকা ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, যা ৩০টি বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাবলিক অ্যাওয়ারনেস উইংয়ের ২০২৪ সালের বার্ষিক তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, জনসচেতনতা ছাড়াই নতুন নোট বাজারে ছাড়ার ফলে জালনোট চক্রের দৌরাত্ম্য বহুগুণ বেড়ে গেছে। এ প্রতিবেদনটি আমাদের বোঝায় যে যখন রাষ্ট্র তার মুদ্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই নতুন নকশা প্রকাশ করে, তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না কোনটি আসল আর কোনটি জাল। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন এবং বাজারে জালনোটের এমন এক সংক্রমণ ঘটছে, যা জাতীয় অর্থনীতিকে ক্যান্সারের মতো ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছে, যার মাশুল গুনতে হচ্ছে সেই সাধারণ জনগণকে।
বাংলাদেশের মুদ্রা ব্যবস্থায় এ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে যে ২৫টি মৌলিক কারণ রয়েছে, তা আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের অযোগ্যতাকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৪ সালের কান্ট্রি স্টাডি রিপোর্ট এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক সমন্বিত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের অবসান এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই হলো এ জগাখিচুড়ি অবস্থার মূল উৎস। এ বিশ্লেষণটি আমাদের ধারণা দেয় যে মুদ্রানীতি যখন পেশাদার অর্থনীতিবিদদের হাত থেকে রাজনৈতিক নেতাদের হাতে চলে যায়, তখন সেটি আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার থাকে না, বরং স্বার্থসিদ্ধির যন্ত্র হয়ে ওঠে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে বিশৃঙ্খলা এবং দুর্নীতির এক নতুন মহোৎসব।
আমাদের মুদ্রার এ দীর্ঘ যাত্রাপথকে ফিরে দেখি, তবে ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এক নির্মম অবক্ষয়ের ইতিহাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দীর্ঘমেয়াদি উপাত্ত জানায়, ২০০০ সালে যেখানে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ, সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশে, আর ২০২৫ সালের শেষে এ হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ অতিক্রম করার আশঙ্কা প্রবল।
এ সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; এগুলো আমাদের দেখিয়ে দেয় যে গত ২৫ বছরে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু তার ক্রয়ক্ষমতা কমেছে অনেক গুণ। ২০০০ সালের ১০০ টাকা আজ কার্যত ১০ টাকার সমান শক্তিও বহন করতে পারছে না। এর সরাসরি অভিঘাতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে এবং এক বিশাল জনগোষ্ঠী নিঃশব্দে দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো—দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও তারা বুঝে উঠতে পারছে না, কেন তাদের শ্রমের বিনিময়ে আজ আর দুবেলা পেট ভরে আহার জোটে না।
আমাদের অর্থনীতিতে সামনে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রক্ষেপিত অর্থনৈতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ যদি মুদ্রার অস্থিতিশীলতা রোধ করা না যায়, তবে ক্যাশ ইন সার্কুলেশন বা বাজারে থাকা কাগুজে নোটের পরিমাণ ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। এ রিপোর্টটি আমাদের ধারণা দেয় যে ২০৫০ সালের উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হতে হলে আমাদের দ্রুত ক্যাশলেস ইকোনমি বা ডিজিটাল লেনদেনের দিকে যেতে হবে, যেখানে নোট পরিবর্তনের কোনো রাজনৈতিক অবকাশ থাকবে না। এ বিবর্তনের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী; যদি আমরা সফল হই তবে ২০৫০ সালে আমাদের বাজার স্থিতিশীলতা ৯০ শতাংশে পৌঁছাবে, নতুবা কাগুজে নোটের অসারতায় আমরা একটি দেউলিয়া জাতিতে পরিণত হব।
এ সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত আমাদের অন্তত ১০টি কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো টাকার বাহ্যিক রূপ বা নকশার মোহ ত্যাগ করে তার প্রকৃত বিনিময়মূল্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং অযৌক্তিক নোট পরিবর্তনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে—টাকা কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের সম্পদ নয়; এটি জনগণের ঘাম, শ্রম ও ত্যাগের লিখিত প্রমাণ। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং আগামী ২৫ বছর কোনো ধরনের নোট নকশা পরিবর্তন না করার বিষয়ে কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে মুদ্রানীতি যখন স্থিতিশীল, পূর্বানুমেয় ও স্বচ্ছ হবে, তখনই বাজারে বিনিয়োগের আস্থা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ পুনরায় তাদের উপার্জিত অর্থের ওপর বিশ্বাস ও নিশ্চয়তা ফিরে পাবে।
অতঃপর এ প্রতিবেদনকে আমাদের আমলে নিতে হবে এবং আমাদের অধিকারের লড়াইকে আরো বেগবান করে। টাকার রঙ বদলালেই জীবনের রঙ বদলায় না, বরং জীবনের রঙ বদলাতে হলে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও সুসংহত অর্থনীতি। আমরা সেই বাংলাদেশের প্রতীক্ষায় আছি যেখানে মুদ্রার গায়ে রাজনৈতিক নেতার ছবি থাকবে না, থাকবে শ্রমিকের মর্যাদা আর কৃষকের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। আজ যদি আমরা চুপ থাকি, তবে আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা কেবল এক ঋণী ও রিক্ত জাতি হিসেবে পরিচিত হব।
আর কতকাল আমাদের রক্ত পানি করা উপার্জনে খেলিবি তুই রাজনীতির পাশাখেলা? এ মরীচিকার মায়াজাল ছিন্ন করে আমরা ফিরে আসব আমাদের হকের দাবি নিয়ে—প্রতিটি নোটের নকশায় নয়, প্রতিটি পয়সার ক্রয়ক্ষমতায় গড়ি আমাদের এক অভেদ্য অর্থনীতির দুর্গ! জনতার গর্জনে চূর্ণবিচূর্ণ হোক সব ষড়যন্ত্রের ছায়া—তোর দেয়া রঙিন কাগজে নয়, আমাদের শক্তিতেই গড়ি আমরা সার্বভৌমত্বের এক নতুন ইতিহাস!
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব: সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ
দাউদ ইব্রাহিম হাসান: গবেষণা সহকারী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়










