দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একটি স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী ‘রাষ্ট্র সংস্কার’-এর ম্যান্ডেট।

১. এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ দূর হওয়া; মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত শক্তির নির্বাচন বর্জনের আহ্বানের পরেও ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়া প্রমাণ করে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ কেউই হাতছাড়া করতে রাজি নয়। তবে গণভোটের বিষয়টি থাকলেও দেশের সিংহভাগ ভোটার এর বিষয়বস্তু ও প্রতিফলন নিয়ে অন্ধকারে ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণভোট নিয়ে প্রচারণা চালালেও ভোটের মূল সংস্কার প্রস্তাবগুলো জনমানসে গেঁথে যাওয়ার মতো কোনো জোরালো প্রচারণা চালায়নি। ফলে গণভোটে সঠিক ভোট প্রদানে মানুষের সংশয় রয়ে গেছে। এ সংশয় না থাকলে ধারণা করি হ্যাঁ ভোটের হার আরো অনেক বেশি হতো।

২. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা যাওয়া স্বস্তির, তবে চ্যালেঞ্জও পাহাড়সম। গত দেড় দশকে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকে যেভাবে দলীয় আজ্ঞাবহ করা হয়েছিল, রাতারাতি তা থেকে বের হয়ে আসা কঠিন; নির্বাচিত সরকার এগুলোর ওপর পুনরায় দলীয় প্রভাব বিস্তার করবে কিনা, সেটিই বড় শঙ্কা। চব্বিশের তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) বিপ্লবীরা এবং প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব সংসদের ভেতরে-বাইরে প্রবল হতে পারে। তারুণ্যের ‘আশু সংস্কার’ আকাঙ্ক্ষা আর প্রবীণ রাজনীতিকদের অভিজ্ঞতার সংঘাত সামাল দেয়াই হবে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের পরীক্ষা।

৩. বিজয়ী দলই সবকিছুর মালিক—এ মানসিকতা থেকে বের হতে হবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের প্রধান কাজ হবে সংসদে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ না করা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় ক্যাডার দিয়ে দখল না করা। অন্যদিকে বিরোধী দল সংসদে যোগ দিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করবে এবং সংসদ বর্জনের পুরনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে।

৪. নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা আমাদের একটি কলঙ্কজনক ঐতিহ্য। এটি রোধে তিনটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন: বিজয়ী দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দিতে হবে—নিজ দলের কেউ সহিংসতা বা দখলবাজি করলে তাকেই আগে আইনের হাতে তুলে দেয়া হবে। সহিংসতা সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ের পূর্বশত্রুতার জেরে হয়, তাই স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলকে সতর্ক থাকতে হবে।

৫. বিএনপি জোট যেমন বিশাল জয় পেয়েছে, তেমনই তাদের ওপর প্রত্যাশার চাপও পাহাড়সম। দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে থাকা ক্ষুধার্ত কর্মীরা যেন চাঁদাবাজি, দখলবাজি বা প্রতিশোধপ্রবণতায় জড়িয়ে না পড়ে, তা কঠোরভাবে রুখে দেয়া সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ। মাহে রমজানের এ সময়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সব রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি এবং শক্তিশালী বিরোধী দলের ন্যায্য, যৌক্তিক ও গঠনমূলক বিরোধিতাসমেতই দলের চেয়ে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সাধারণ জনগণের মুখোশে সাংগঠনিক ‘মববাজি’ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সমাজের সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদার জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে; তাই সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অবারিত রাখতে হবে। এ নির্বাচন গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়, বরং নতুন যাত্রার শুরু। চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা যে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন দেখেছিল, তা পূরণ করতে হলে রাজনীতিবিদদের নতুন প্রজন্মের ভাষা বুঝতে হবে।

মাহাবুব রাহমান: প্রকাশক, আদর্শ