গত মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সেখানে তারা শিক্ষা খাতে বেশকিছু সংস্কার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। উদ্যোগগুলোর মধ্যে ছিল পাঠ্যসূচি সংস্কার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনে রূপান্তর, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার (টিভিইটি) শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণে জোরদান ও আইসিটি শিক্ষার প্রসার। এসব প্রতিশ্রুতি আশাব্যঞ্জক মনে হলেও একটি সুসমন্বিত জাতীয় কৌশল বা প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি ছাড়া অসম্পূর্ণই থেকে যাচ্ছে।
আশাবাদী কিন্তু খণ্ডিত উদ্যোগ
প্রস্তাবিত পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে শিক্ষা বাজেট বাড়ানো, পাঠ্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও বেসরকারি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ উন্নয়নের কথা শোনা গেছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বিশেষ করে আইসিটি শিক্ষা যুগোপযোগী করে তোলার ওপর জোর দেয়া সাম্প্রতিক বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—কত টাকা বরাদ্দ করা হবে? সেই অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা কীভাবে নিরূপণ করা হবে? তাছাড়া টিভিইটিকে সংস্কার করা (যা দক্ষতা ঘাটতি কমাতে অত্যন্ত জরুরি) নিয়ে সামান্য উল্লেখ থাকলেও তার বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। আইসিটি শিক্ষা সংস্কারে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ আনা যেতে পারে বলে বলা হয়েছে, কিন্তু কেন অন্য কোনো দেশ বা দেশের অভ্যন্তরীণ বিশেষজ্ঞদের কথা ভাবা হচ্ছে না, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।
সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব
এসব ঘোষণায় একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে আসে—শিক্ষা নীতিকে সামগ্রিক রূপরেখায় না ফেলে খণ্ডিত উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। দুর্নীতি দমন, প্রশিক্ষণ ঘাটতি পূরণ ও পাঠ্যসূচি হালনাগাদের প্রতিশ্রুতি থাকলেও সেগুলোকে সমন্বিত কোনো কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আনা হয়নি। তাছাড়া ‘প্রতিযোগিতা’ আর ‘ইংরেজি ভাষা-দক্ষতা’ বৃদ্ধির কথায় যে জোর দেয়া হচ্ছে, তার পেছনে দেশীয় প্রেক্ষাপট কতখানি বিবেচিত হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। ফলে জনগণের ধারণা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার টুকরো টুকরো পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে যা আগের শেখ হাসিনা প্রশাসনের সময়কালে সৃজনশীল পদ্ধতি আর অভিজ্ঞতাভিত্তিক পদ্ধতির মতো অসম্পূর্ণ ও অপরীক্ষিত উদ্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের উপকারের চেয়ে বিভ্রান্তিই বাড়িয়েছিল।
অতীত থেকে শিক্ষা
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সাজাতে হলে এটা স্বীকার করতেই হবে যে একটি জাতির পরিচয়, সক্ষমতা ও অগ্রগতির ভিত্তিই হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা। অতীতের দুঃসাহসী ও অকস্মাৎ আরোপিত সংস্কারগুলো প্রমাণের আলোকে (empirically) যাচাই না করে প্রয়োগ করা হয়েছিল, ফলে সেটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো অস্থিতিশীল করে তোলে। পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় এ ধরনের ‘অর্ধসিদ্ধ’ পদ্ধতি কার্যকর করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আরো সংশয়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল। একটি শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য চাই একটি সুস্পষ্ট দর্শন যা জাতীয় অগ্রাধিকার ও শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে উঠবে। পর্যাপ্ত পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া, স্বচ্ছ অংশীদারত্ব এবং সুসংগঠিত নীতিমালা ছাড়া নতুন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা মানে বাস্তবিক অর্থে দিকনির্দেশনা ছাড়া যাত্রা শুরু করা।
প্রমাণভিত্তিক নীতির দিকে অগ্রসরতা
টিভিইটি বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষা যা সরাসরি দেশের সক্ষমতা এবং অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে, তা সংস্কার করতে গেলে অবশ্যই রাজনৈতিক সুবিধাবাদী সিদ্ধান্ত বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয়তার মূল্যায়ন ও নানা পর্যায়ের অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের বড় সংস্কার ফলপ্রসূ হতে পারে না। আন্তর্জাতিক সেরা চর্চাগুলোকে দেশীয় প্রেক্ষাপটে অভিযোজন করা জরুরি, কিন্তু অপরীক্ষিতভাবে নয়। তা না হলে আগেকার ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘কতটুকু করা যাবে, দেখা যাক’ ধরনের মনোভাব আরো উদ্বেগজনক। এর মধ্যে যথাযথ লক্ষ্য, কার্যকর টাস্কফোর্স বা জবাবদিহি কাঠামোর অভাব স্পষ্ট, যা ভবিষ্যতে নীতিগত অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের প্রয়োজন
যদি সরকার সত্যিই টেকসই একটি পথ খুঁজে পেতে চায়, তাহলে তাদের একটি বিশেষায়িত, স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা দরকার। প্রমাণভিত্তিক গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এই কমিশন গড়ে তুললে কেবল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতিমালা ও প্রস্তাবনা তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে করে বাংলাদেশ পরবর্তী শতাব্দীর জন্য একটি সুদূরপ্রসারী ভিশন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এই কমিশনের কাজ হবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, গবেষণা এবং নানা পর্যায়ের অংশগ্রহণমূলক মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা সাজানো, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে অস্থির করতে না পারে। সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে এই কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে ও কোনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে।
সামগ্রিক সংস্কারের আহ্বান
সরকারের সাম্প্রতিক পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতিগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বকে বিবেচনা করে কিছুটা সচেতনতার ইঙ্গিত দেয় বটে, কিন্তু আসল রূপান্তরের জন্য যে পরিকল্পিত ও প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি প্রয়োজন, তা এখনো অনুপস্থিত। শিক্ষা কেবল মুখে মুখে ‘জাতির মেরুদণ্ড’ নয়—এটি জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিকদের প্রস্তুত করে, জাতীয় মূল্যবোধ গড়ে তোলে এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা বিকশিত করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ সক্ষমতা জোরদার করেছে—যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও চিন্তাশক্তির বিকাশে পথ দেখিয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র উদ্ভাবন ও আন্তঃবিষয়ক শিক্ষায় এগিয়ে; ফ্রান্স তাদের দর্শন ও উচ্চাঙ্গ প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে; চীন স্টেমনির্ভর (STEM- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক বিকাশের ধারা মজবুত করেছে; জার্মানি দ্বৈত ভোকেশনাল মডেলের মাধ্যমে শিল্পের সঙ্গে শিক্ষা সংযোগ করেছে; আর ফিনল্যান্ড সামগ্রিক সমতা ও গুণগত শিক্ষার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। আমরা কি বাংলাদেশে আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করতে পেরেছি? আমাদের নাগরিক জীবন বা সামাজিক কল্যাণের মান কতটুকু উন্নত হয়েছে? যথাযথ তথ্য-উপাত্ত ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছাড়া হঠাৎ করে সংস্কার কার্যক্রম নিলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুফল আসবে না। এগুলোর ভিত্তি থাকতে হবে মৌলিক তথ্য, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধাপে ধাপে রূপায়ণের মধ্য দিয়ে।
দীর্ঘদিনের লুটপাট, নিপীড়ন ও অনিয়মে জর্জরিত হওয়ার পর বাংলাদেশ আবার নতুনভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে—তারা চাইলে টুকরো টুকরো উদ্যোগ নিয়ে জনসাধারণকে হতাশ করতে পারে, অথবা সুপরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা নীতির বীজ বপন করে যেতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি দেশের পুনর্গঠনের কেন্দ্রে রাখা হয় এবং সেটি যদি প্রামাণ্য উপাত্তভিত্তিক পদ্ধতি ও বৃহত্তর অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে আমরা একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যুগে প্রবেশ করতে পারব, যা সাম্প্রতিক গণজাগরণের চেতনাকে সার্থকভাবে ধারণ করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক এক দিগন্ত খুলে দেবে।
আসিফ বায়েজিদ: শিক্ষা নীতি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরা, যুক্তরাজ্য










