শিশু-কিশোরদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো পানিতে ডুবে মৃত্যু, যা একটি নীরব ঘাতক এবং বর্তমানে একটি অবহেলিত জাতীয় সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গত বছরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরে তিন লাখ লোক পানিতে ডুবে মারা যায়, যার ৯০ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয়। বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী এক-চার বছরের শিশুরা পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মারা যায় এবং দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ বয়স হলো পাঁচ-নয় বছর। ওই প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, ছেলে শিশুরা মেয়ে শিশুর তুলনায় দ্বিগুণ পানিতে ডুবে মারা যায়। পানিতে মৃত্যু পরিহারযোগ্য। তবে পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিহারে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে অপেক্ষাকৃত কম।

বাংলাদশের প্রথম স্বাস্থ্য এবং তথ্য জরিপ (২০১৩) অনুযায়ী, এক থেকে ১৭ বছরের শিশুদের অপমৃত্যুর প্রধান কারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু, যা যৌথভাবে নিউমোনিয়া, অপুষ্টি এবং কলেরা দ্বারা মৃত্যুর চেয়েও বেশি। বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাস্থ্য এবং তথ্য জরিপ (২০১৬) অনুযায়ী বছরে ১৪ হাজার ৪৩৮ জন (এক-১৭ বছর বয়সী) শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো— ১. বয়স্কদের তত্ত্বাবধানের অভাব ২. গ্রামে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের অভাব ৩. অতি দরিদ্রতা ৪. পুকুর-জলাধারে নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাব এবং ৫. সাঁতার না জানা। বাংলাদেশে প্রায় আট-নয় বছরের শিশুদের সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা যেতে দেখা যায়। যদিও একটি সুস্থ শিশুকে চার-পাঁচ বছর বয়স থেকে সাঁতার শেখানো উচিত। পুকুর, ডোবা, খাল, বালতি এবং বাকেট ইত্যাদি জায়গায় বিভিন্ন বয়সী শিশুরা মারা যায়। হোসাইন এবং তার সহযোগীরা (২০২২) গবেষণায় দেখান যে পাঁচ বছর বয়সীদের ৮০ শতাংশ পানিতে ডুবে মৃত্যু ঘটে বসতঘর থকে ২০ মিটার দূরত্বের মধ্যে পুকুর-জলাশয়ে। ডিজাস্টার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ড্যাডো) উদ্যোগে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে দুটি ইউনিয়ন সরিকাইত এবং মাইটভাঙ্গায় ১৩ হাজার ৮৫৭টি পরিবারে একটি পারিবারিক জরিপ পরিচালিত হয়েছিল। গবেষণায় গত ছয় বছরে ২০৫টি পরিবারে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১৭টি মৃত্যু এবং ৮৮টি দুর্ঘটনা ঘটনা রয়েছে। ১১৭টি মৃত্যুর মধ্যে ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশু শূন্য-চার বছর বয়সী, যাদের গড় বয়স ৩ দশমিক ২। উল্লেখযোগ্যভাবে এ শিশুদের ৮৮ শতাংশ ডুবে যাওয়ার সময় তত্ত্বাবধানে ছিল না। বেশির ভাগ ঘটনা (৯৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ) ঘটেছে বেড়াবিহীন পুকুরে, যা প্রায় বাড়ির কাছাকাছি অবস্থিত। বাংলাদেশে একাধিক শিশু বিশেষভাবে জোড়া শিশু একই স্থানে একই সঙ্গে পানিতে ডুবে মারা যেতে দেখা যায়। সাধারণত একটি শিশু অন্য শিশুকে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার সময় বাঁচাতে গিয়ে এক সঙ্গে মারা যায়। এতে বোঝা যায় শিশুকে পানি থেকে নিরাপত্তা কৌশল বিশেষত নিরাপদ উদ্ধার কৌশল সঠিকভাবে শিক্ষা দেয়া হয় না।

সচেতনতা ও বয়স্কদের দ্বারা শিশু তত্ত্বাবধানের অভাব এবং অবহেলাকে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। মানুষের অনেক সময় তাদের শিশু নিরাপদে আছে মনে হলেও শিশুমৃত্যুর বাস্তবতা ভিন্ন হয়। কেউই ভাবে না তাদের শিশু পানিতে ডুবে মারা যেতে পারে। সঠিক তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো শিশু পানি থেকে নিরাপদ নয়। অনেকেই বলে তাদের বড় ছেলেমেয়েরা শিশুসন্তানকে দেখাশোনা করে বা তাদের আশপাশে অনেক মানুষ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো বড় ভাই-বোনের তত্ত্বাবধানে থাকার সময় অনেক শিশু মারা যেতে দেখা যায়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অনেক লোকের বসতবাড়িতেও শিশুদের পুকুরে ডুবে মারা যেতে দেখা যায়। মনে রাখবেন, অভিভাবকই শিশুরা প্রধান নিরাপত্তাকারী। এমনকি সাঁতার জানা শিশুও পানিতে ডুবে মারা যেতে পারে। কেননা শিশুরা পানিতে একা বিপদে পড়ে। সাঁতার শেখানোর সময় যে নির্দেশনা অনুযায়ী সাঁতার কাটে একা পানিতে পড়ে সে সেভাবে সাঁতার কাটতে পারে না বরং পানি খেতে খেতে ডুবে যায়। তাছাড়া শিশুরা অত্যন্ত দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। আপনার সরাসরি চোখের দৃষ্টিতে না থাকলে সে হয়তো পানিতে চলে গিয়েছে। আর পানিতে ডুবে যাওয়া অত্যন্ত নীরব ঘটনা। শিশুরা পানিতে ডুবে যাওয়ার সময় কোনো আওয়াজ বা সাহায্য প্রার্থনা করতে পারে না, ফলে শিশুরা নীরবে পানিতে ডুবে মারা যায়।

ডব্লিউএইচও (২০১৭) পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণে ছয়টি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। ১. প্রাক স্কুল বয়সী শিশুদের পানি থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ ২. পানিতে গমন পথে বেষ্টনী প্রদান ৩. সাঁতার শেখানো এবং পানি থেকে নিরাপত্তা কৌশলে প্রশিক্ষণ প্রদান ৪. বন্যা ও অন্যান্য পানি থেকে সংঘটিত দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা ৫. পানি থেকে শিশুদের নিরাপদে উদ্ধার এবং সিপিআর প্রশিক্ষণ প্রদান ৬. বোট, জাহাজ ও ফেরিতে নিরাপদে যাতায়াতে কার্যকর বিধি ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং প্রতিষ্ঠাকরণ। উল্লিখিত ছয়টি নিবারণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে চারটি কৌশল প্রণয়নের সুপারিশও করা হয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরের কর্মকাণ্ডে সমন্বিতভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা বিবেচনা করা; কৌশলগত যোগাযোগের মাধ্যমে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা; তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং গবেষণার মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যু নিবারণে সৃজনশীল কৌশল প্রণয়ন করা; জাতীয় নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন করা। ডব্লিউএইচও ২০১৭ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যু হারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণসহ সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের কর্মীদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের কথা বলেছে।

কমিউনিটি ডে কেয়ার বেষ্টনীযুক্ত খেলাঘর গণসচেতনতা বৃদ্ধি সিপিআর প্রশিক্ষণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করছে। ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে পানিতে মৃত্যুসংশ্লিষ্ট মানবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক উল্লেখ করে নিবারণ কৗশল বাস্তবায়নের জন্য জোর দিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার আমন্ত্রণে ডব্লিউএইচও বিশ্বব্যাপী পানিতে ডুবে মৃত্যু বিষয়ে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালনে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২১ সাল থেকে প্রতি বছর ২৫ জুলাই বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিহার দিবস পালনের ঘোষণা দিয়েছে। ডব্লিউএইচও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিহার বিষয়ে জনসচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। ২০২৩ সালে পানিতে ডুবে মৃত্যু নিবারণ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘যে কেউই পানিতে ডুবে যেতে পারে, কারো ডুবে যাওয়াই কাম্য নয়’। ২০২৫ সালের পানিতে ডুবে মৃত্যু নিবারণ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, আপনার গল্প একটি জীবন বাঁচাতে পারে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট মৃত্যু মোকাবেলায় দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রস্তুতি এবং নিবারণমূলক কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে থাকলেও পানিতে ডুবে মৃত্যু বিষয়ে কার্যক্রম অত্যন্ত অপ্রতুল। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) ২০০৬ এবং ২০১৩ সময়ে রায়গঞ্জ, শেরপুর এবং মনোহরদী উপজেলায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কমিউনিটি ডে কেয়ার সেন্টার (আঁচল) এবং সাঁতার প্রশিক্ষণকে কম খরচে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণের কার্যকর কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করছে। উপর্যুক্ত দুটি নিবারণ কৌশলের সঙ্গে জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করলে আরো বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু নিবারণে বাস্তবায়িত আরো একটি প্রকল্পে কোনো এলাকায় একই সঙ্গে বেষ্টনীযুক্ত খেলাঘর এবং শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র বাস্তবায়ন করলে শিশুমৃত্যু নিবারণে ভূমিকা রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালের স্বাস্থ্য নীতিতে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকেও একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। শিশু নিরাপত্তায় পাইলট প্রকল্পে পানিতে ডুবে মৃত্যুও বিবেচনা করলেও সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প এখনো সীমিত।

ডিজাস্টার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ড্যাডো) পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জনসচেতনতা এবং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং জলাধার থেকে সুরক্ষা কৌশল শেখানো, অনিরাপদ জলাধারে বেষ্টনী প্রদান এবং কমিউনিটি ডে কেয়ার স্থাপনে কাজ করছে। অর্থ সংকট, বাস্তবায়নের সক্ষমতার অভাব এবং অন্যান্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণে ডব্লিউএইচও কর্তৃক প্রদানকৃত নিবারণ কৌশলকে দেশব্যাপী বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। এ অবস্থায়, ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের মাধ্যমে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণে ভূমিকা পালন করা যেতে পারে। সমাজের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আমরা সবাই শিশুমৃত্যু নিবারণে ভূমিকা পালন করতে পারি। যেমন—১. শিক্ষা, ঘর থেকে শুরু হয়, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেয়ার করা, ২. বাড়িতে শিশু পানি থেকে নিরাপদ কিনা পর্যবেক্ষণ করা, ৩. পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ভয়াবহতা পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ করা, ৪. বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনার আড্ডায় অন্য বিষয়ের সঙ্গে এ বিষয় উপস্থাপন করা, ৫. প্রতিবেশীদের শিশুরা নিরাপদ কিনা পর্যবেক্ষণ করা, ৬. উঠান বৈঠকের ব্যবস্থা করা, ৭. জলাধারের পাশে বেষ্টনী প্রদানের ব্যবস্থা করা, ৮. নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা এবং অন্যকেও উৎসাহিত প্রদান, ৯. আর্থিক সক্ষমতা থাকলে দরিদ্র পরিবারকে বেষ্টনীযুক্ত খেলাঘর প্রদান, ১০. শিশুদের সাঁতারের শেখানোর ব্যবস্থা করুন (একটি সুস্থ বাচ্চা চার-পাঁচ বছর বয়স থেকে সাঁতার শিখা শুরু করতে পারে), ১১. ইউটিউব এবং স্বীকৃত প্রশিক্ষণকারীর কাছ থেকে সিপিআর প্রশিক্ষণ ১২. আপনার এলাকায় যুবকদের সমন্বয়ে ক্যাম্পেইন দল গঠন ১৩. জাতীয় জনসচেতনতা ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ ১৪. আপনার এলাকায় কমিউনিটি ডে কেয়ারের সম্ভাব্যতা যাচাই করুন এবং পারলে বাস্তবায়ন করুন।

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণে সরকারি ছাড়াও এনজিও, কমিউনিটি অর্গানাইজেশন এবং বেসরকারি খাতের কার্যক্রম এখনো সীমিত। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণ কৌশল বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের জনগণের অংশগ্রহণ এবং অবদান রাখা জরুরি।

ড. মো. ইদ্রিস আলম: প্রধান নির্বাহী, ডিজাস্টার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ড্যাডো), বাংলাদেশ; অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়