অনেকেই ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে বেরিয়ে পড়েন ভ্রমণে। এর বাইরেও ঈদের কেনাকাটাসহ নানা কারণে মানুষের যাতায়াত বেড়ে যায়। ঈদের ছুটি শেষে আবার যার যার নির্দিষ্ট গন্তব্যে ফেরার যাত্রা শুরু হয়। সব মিলিয়ে ঈদ উপলক্ষে সড়কে যাত্রীদের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সড়কে চাপ বেড়ে যায় বলাটাই অধিক সংগত। কেননা দেশের পরিবহন সংখ্যা ও সড়কপথের আকারের সেই বাড়তি যাত্রী সামাল দেয়ার সক্ষমতা নেই। যে কারণে জল-রেল-সড়কপথে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। এ বিশৃঙ্খলার মাত্রা এত বেশি যে তাতে বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় যাতায়াত ব্যবস্থা হয়ে ওঠে আরো বেশি প্রাণঘাতী। এর সর্বশেষ বড় একটি নজির হলো ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নদীতে বাসডুবির ঘটনা। এতে এ সম্পাদকীয় লেখার সময় পর্যন্ত অন্তত ২৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া একাধিক মানুষ নিখোঁজ এবং আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।
এর আগে ঈদের দিন দিবাগত রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় ট্রেন-বাসের সংঘর্ষ ঘটে। এ ঘটনায় বাসটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বাসচালকসহ অন্তত ১৫ জন। এছাড়া নৌপথে দুই লঞ্চের চাপে যাত্রীর পা কাটা পড়ে মৃত্যু বা বগুড়ার সান্তাহারে ট্রেনের নয়টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনাসহ পুরো দেশে ছোট-বড় অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। সরকারি হিসাবে ঈদুল ফিতরে ছুটির সাতদিনে (১৭-২৩ মার্চ) সড়কে ৯২ দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রাথমিক হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি। যেমন যাত্রী কল্যাণ সমিতির ২৪ মার্চের এক প্রতিবেদনে ঈদের ১০ দিনের (১৪-২৩) দুর্ঘটনার তথ্যে বলা হচ্ছে, এ সময় ২০১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৬ জন নিহত ও ৪২১ জন আহত হয়েছেন। সরকারি বা বেসরকারি হিসাবে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যার ব্যবধান থাকলেও কোনোটিই উল্লেখযোগ্য হারে কম নয়, বরং উদ্বেগজনক। এসব পরিসংখ্যান দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার শেকড় কতটা গভীরে রয়েছে তা জনসম্মুখে আনে। আর যখন দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফলে বছর বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, সেগুলোকে আর অনাকাঙ্ক্ষিত বলা সমীচীন হয় না।
সড়কের অব্যবস্থাপনাগুলোও প্রায় সর্বজনবিদিত। কিন্তু এর পরও কোনো সরকারের আমলেও বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ করার নজির মেলে না। পুলিশ সদর দপ্তরের সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে, যার হার ৪২ শতাংশ। এজন্য অবশ্য চালকরা অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানোর জন্য তাদের ক্লান্তিকে দায়ী করেছেন। এছাড়া ঈদকেন্দ্রিক অতিরিক্ত যাত্রীচাপও বড় কারণ। কেননা স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চাপ পড়ে সড়ক, নৌ ও রেল ব্যবস্থার ওপর, যা সামাল দেয়ার অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা দেশের নেই। ফলে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল, সময়সূচি ও নিয়মনীতি না মানা সড়ককে অনিরাপদ করে তোলে। আবার আইন প্রয়োগের শিথিলতাও এ ক্ষেত্রে দায়ী। বছরের অন্য সময়েও যেখানে ট্রাফিক আইন অমান্য করা নিত্যনৈমিত্তিক, সেখানে ঈদের সময় তা প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি—সবই তখন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যায়। এর বাইরে সমন্বয়হীনতার অভাবও রয়ে গেছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে পৃথক কর্তৃপক্ষ থাকলেও কার্যকর সমন্বয় নেই। কুমিল্লার দুর্ঘটনার মতো ঘটনায় রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা যেমন স্পষ্ট, তেমনি দৌলতদিয়ার ঘটনায় ফেরিঘাট ব্যবস্থাপনার ঘাটতি চোখে পড়ে। আর এসব সংকটের মূলে রয়েছে বছরব্যাপী সড়কে অব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলার অভাব। এতে পরিবহন খাতে কিছু সমস্যা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ফিটনেস তদারকি ও লাইসেন্স পদ্ধতির দুর্বলতা, অব্যবস্থাপূর্ণ টার্মিনাল ও ঘাট, যেখানে যাত্রী ওঠানামার ক্ষেত্রে ন্যূনতম নিয়ম মানা হয় না। রয়েছে জবাবদিহির অভাব।
অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোর সড়ক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। যেমন জাপানে গণপরিবহনে সময়ানুবর্তিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশে চালকদের নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গাড়ি চালানোর সুযোগ নেই; নিয়ম ভাঙলে তাৎক্ষণিক শাস্তি হয়। এমনকি ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হাইওয়ে প্যাট্রোলিং ও ইলেকট্রনিক নজরদারি বাড়িয়ে দুর্ঘটনা কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা এখনো চলছে সেকেলে পদ্ধতিতে। এখানে ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকর করাই দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজও ট্রাফিক পুলিশরা হাত-লেজার রশ্মির ইশারায় গাড়ি থামাতে বাধ্য হন। অথচ কঠোর নজরদারি ও ট্রাফিক আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই অনেক অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব ছিল। বছরব্যাপী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার নিয়মনীতি পরিপালন করা গেলে ঈদযাত্রাও তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ করা যেত।
ঈদের আনন্দ উদযাপনে যারা ঘরে ছুটে যায়, তাদের জীবন যাত্রাপথে থেমে যাক, তাদের স্বজনদের আনন্দ মলিন হয়ে যাক, একটা ট্রমায় পরিণত হোক তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ঈদের আনন্দ সবার জন্য অটুট রাখতে হলে সরকারকে ও সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিত হয়ে কাজ করতে হবে। কাজ করতে হবে যেন বছরব্যাপী সড়ক সবার জন্য নিরাপদ থাকে। মনে রাখা প্রয়োজন যাত্রী-চালক-পথচারী সবাই সড়ক ব্যবস্থাপনার অংশীজন। তাদেরও সচেতন হতে হবে। কারণ দুর্ঘটনার পেছনে তাদের অসচেতনতাকে দায়মুক্তি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।










