বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা। একটিকে উপেক্ষা করে অন্যটির উন্নতিতে উৎকর্ষ অর্জন কঠিন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, তিন ক্ষেত্রেই ব্যাপক ঘাটতি ও অবহেলা। ১৯২১ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম ছিল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেলের। এ কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি দুটোই বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তব চিত্র এর বিপরীত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগ পর্যন্ত একাডেমিক ক্ষেত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতার ধারা বজায় ছিল। পাকিস্তান পর্বের ২৪ বছরেও সফলতার ধারা বজায় থেকেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর শিক্ষক রাজনীতি ও অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে এর ক্ষয় শুরু হয়। গত দেড় দশকে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ও শিক্ষক নিয়োগে মেধাকে গৌণ করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ও গবেষণা পরিবেশে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। গবেষণায় পিছিয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি, অবনতি ঘটেছে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের, শিক্ষার মানও এখন নিম্নমুখী। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। শিক্ষা ও গবেষণায় মানোন্নয়ন হবে। ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির আধিপত্য কমবে। শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিগত সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র খুব একটা বদলেছে বলে মনে হচ্ছে না। শিক্ষকদের একটি অংশ এখনো রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডে বেশি ব্যস্ত। শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত বিভিন্ন আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এর পরিবর্তে অবকাঠামোগত প্রকল্পেই মনোযোগ বেশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব ও ঐতিহ্য কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে নয়, বরং গবেষণা, জ্ঞান সৃজন ও মানসম্পন্ন শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিশ্চিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি তার অতীত ঐতিহ্য ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাতি ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে তাকে কেবল অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দিলে হবে না, শিক্ষা ও গবেষণার ভিতকে আরো মজবুত করতে হবে। ছাত্র-শিক্ষককে দলীয় ও লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণায় উৎসাহী হতে হবে। শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠনে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নতুন পাঠ্যক্রম প্রণয়নেও গুরুত্ব দেয়া উচিত।
বিগত দেড় দশকের শাসনামলে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, সন্ত্রাস, গেস্টরুম সংস্কৃতিতে আক্রান্ত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সরকার পতনের প্রায় এক বছর হতে চললেও বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার মান বাড়াতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। গত এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের বড় অংশজুড়ে ছিল সভা-সেমিনার আয়োজন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ননির্ভর। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গবেষণায় গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হলেও এ বিষয়ে কোনো বাস্তবিক উদ্যোগ দেখা যায়নি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিগত দেড় দশকে শিক্ষকরা ক্লাসের চেয়ে রাজনীতি, নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য আর সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পদপদবি বাগাতে ব্যস্ত ছিলেন। এ শিক্ষকদের ক্লাস কিংবা অন্য কোনো একাডেমিক প্রয়োজনে পাওয়া যেত না। এখন আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের অনেকে পলাতক কিংবা গা বাঁচিয়ে চলছেন। আর আওয়ামীবিরোধী শিক্ষকরা এখন রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হয়েছেন। শিক্ষকদের ক্লাস নেয়ার ধরন ও মান একই রকম থেকে গেছে। এতে শিক্ষার্থীরাই কেবল প্রতারিত হচ্ছেন।
যে দেশে যত বেশি গবেষণার জন্য আর্থিক প্রণোদনাসহ অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়, সে দেশ তত বেশি সমৃদ্ধ। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ইত্যাদি দেশে পুনরায় গবেষণা ছাড়া অপেক্ষাকৃত ছোট বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নে বিগত সরকারের মধ্যে সদিচ্ছার ব্যাপক ঘাটতি ছিল। শিক্ষা খাতে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ বিচারে বাংলাদেশ রয়ে গেছে বিশ্বে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি। শিক্ষা ও অন্যান্য খাত—সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রক্রিয়া দলীয়করণ ও প্রকল্পে প্রদত্ত বাজেট ভাগ-বাটোয়ারার অপসংস্কৃতির শিকার হয়েছে। এ কারণে পঠন-পাঠনকেন্দ্রিক সংস্কারগুলো উপেক্ষিত থেকে গেছে এবং অবকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্প গুরুত্ব পেয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে বেশ কয়েকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ রকম বরাদ্দ এবং প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, ছাত্র সংগঠন, নেতাকর্মী ও ঠিকাদার গোষ্ঠীর জন্য ছিল লুটপাটের একটি বড় ক্ষেত্র। সরকারের দিক থেকেও এগুলো ছিল উন্নয়ন অর্জনকে দৃশ্যমান করা ও রাজনৈতিক বৈধতা দেয়ার একটি সস্তা কৌশল।
গবেষণা প্রকাশনার মান ও সংখ্যা— দুটোতেই দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভীষণভাবে পিছিয়ে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ও জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার খ্যাতি ও অবদানের কারণে ‘বিশ্বমানের ফ্ল্যাগশিপ প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে পরিচিত। এসব প্রতিষ্ঠানে গবেষণার শ্রেষ্ঠত্ব শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও বাংলাদেশ একটি ‘বিশ্বমানের ফ্ল্যাগশিপ বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে বঞ্চিত। এর পেছনে মূল দুটি কারণ হলো রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত গবেষণা ব্যবস্থাপনা। গবেষণা জালিয়াতি, চৌর্যবৃত্তি, কপি-পেস্টের অপসংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জার্নাল পরিচালনা ও প্রকাশনায় স্বজনপ্রীতি-অনৈতিক কর্মকাণ্ডের তালিকাটি অনেক দীর্ঘ। গবেষণার নামে লেখক, সম্পাদক ও রিভিউয়ারদের সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় ছাপা হচ্ছে অজস্র প্রবন্ধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অব্যবস্থাপনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্যোগে প্রকাশ পাচ্ছে জার্নাল, যার কোনো বৈশ্বিক স্বীকৃতি কিংবা মানদণ্ড নেই। আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদরা সম্পাদনা বোর্ডে নেই। আবার নেই কোনো সুস্পষ্ট গবেষণা জালিয়াতির নীতি। অধিকাংশ জার্নাল স্কোপাস ইনডেক্স না হওয়ায় বৈশ্বিক যে জ্ঞানভাণ্ডার সেখানে এসব প্রকাশনার তেমন কোনো নলেজ ফুটপ্রিন্ট নেই। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার নামে চলছে একরকম প্রহসন। নেই কোনো জবাবদিহি। গবেষক শিক্ষকের অধিকাংশেরই নেই কোনো যাচাইযোগ্য গবেষণা প্রোফাইল (যেমন গুগল স্কলার পেজ)।
শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি নিশ্চিত করা দুরূহ কাজ। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিকতর উন্নয়ন’ প্রকল্পে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণায় সমান গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত রূপান্তরের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। কেননা শিক্ষা ও গবেষণায় গুণগত পরিবর্তন ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের উৎকর্ষ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায়ও আদর্শ হয়ে উঠুক।










