কোনো একক কৌশল বা অংশীজনের মাধ্যমে সড়ককে নিরাপদ করে তোলা সম্ভব নয়। নিরাপদ সড়ক তৈরিতে সরকার, ট্রাফিক পুলিশ ও জনগণের সমান অংশগ্রহণ প্রয়োজন। আবার কেবল নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে সড়ককে ঝুঁকিমুক্ত করা যায় না। নীতি বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ। আর এক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতা গড়ে তোলা আবশ্যক। বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করলে এগুলোর বড় ঘাটতি চোখে পড়ে। যে কারণে দেশের সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে।
গত বছর সারা দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন এবং আহত হয়েছেন আরো ১৪ হাজার ৮১২ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সম্প্রতি এ তথ্য তুলে ধরেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সড়কে দুর্ঘটনা ২০২৪ সালের তুলনায় ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেড়েছে। আর সড়কে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এছাড়া আহতের সংখ্যা বেড়েছে ১৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এসব তথ্যই বলে দেয় দেশের সড়কে জনগণের জীবন কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে।
নিরাপদ সড়ক তৈরির প্রসঙ্গ এলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ম-কানুন বাস্তবায়ন না হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। আর এর দায় চাপানো হয় সরকারের ওপর। এটা সত্য যে আইন-কানুন বাস্তবায়ন করতে না পারার দায় সরকারের। সরকার ও সড়কে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষাকারী বাহিনীর দৃঢ়ভাবে আইনের প্রয়োগে সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন, যাতে সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু সড়ককে অনিরাপদ করে তোলার বিষয়ে নাগরিক তথা সড়ক ব্যবহারকারীদের দায়মুক্ত রাখা যায় না।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, এর পেছনে চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালানোর মনোভাব এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন বহুলাংশে দায়ী। এখানে দুজন অংশীজন রয়েছে। এক. চালক এবং দুই. পরিবহন মালিক। গণপরিবহনে বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে গতিসীমার বাইরে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বেশি ট্রিপ দেয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। আর বাড়তি মুনাফার লোভে পরিবহন সংস্থাগুলো চালকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। যে কারণে তাদেরও বাধ্য হয়ে অনেক বেশি সময় ধরে কাজ করতে হয়। ফলে তাদের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ পড়ে। অনেকে ঘুম চোখে নিয়ে বেসামাল হয়ে গাড়ি চালান, যা প্রকারান্তরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালান, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে পরিবহন মালিকরা লক্কড়ঝক্কড়, অচল যানবাহনে রঙ লাগিয়ে যেনতেন মেরামত করে রাস্তায় নামিয়ে দেন। এসব ত্রুটিপূর্ণ বাহনের কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।
এছাড়া ব্যক্তিগত যানের চালক থেকে শুরু করে যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যেও প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাব রয়েছে। সেই সঙ্গে ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাও বেশি। অর্থাৎ একদিকে যেমন ট্রাফিক আইনের বাস্তবায়ন নেই, অন্যদিকে চালক ও যাত্রীদের মধ্যেও তা উপেক্ষা করার প্রবণতা রয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি মেনে চলে না। ট্রাফিক পুলিশকে হাত দেখিয়ে গাড়ি থামা-চলার নির্দেশ দিতে হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এ কাজের জন্য হাতে লেজার লাইট ও লাঠিও ব্যবহার করতে দেখা যায়। লেজার লাইটের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি রয়েছে চালক ও পথচারীদের। শুধু সড়ক নয়, বিমানবন্দরের উড্ডয়ন ও অবতরণরত উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে লেজার লাইট। সড়কে সাধারণত জেব্রাক্রসিংয়ের আগে গাড়ি থামার নিয়ম। আর গাড়ি থামলে জেব্রাক্রসিং দিয়ে পথচারীরা পার হবেন। কিন্তু গাড়িচালকরা যেমন এটা মানেন না, তেমনি পথচারীরাও রাস্তা পারাপারের নিয়ম মানেন না। সব মিলিয়ে বলা যায়, সড়কের বিশৃঙ্খলা একটা দুষ্টচক্রে আটকে গেছে। নাগরিকরা সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছে, সরকার কখনো সাধারণ নাগরিক, কখনোবা চালক ও পরিবহন মালিকদের দোষারোপ করছে। অথচ নিরাপদ সড়ক তৈরি করতে হলে সবার সমান অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তবু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণ। মনে রাখা প্রয়োজন যে সড়কের দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাগরিকরাই। কারো জীবন বিপন্ন হয়, যার শোক বয়ে চলতে হয় আত্মীয়-স্বজনদের। আবার পরিবারের উপার্জনকারী মারা গেলে আর্থিক টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। আবার দুর্ঘটনায় গাড়িসহ অন্যান্য পণ্যের ক্ষতি হয়। এটিও একপ্রকার আর্থিক ক্ষতি। কিন্তু এর পরও নাগরিকের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। আবার সড়ক ব্যবহারকারী হিসেবে সবচেয়ে বড় অংশীজন তথা নাগরিককে নিরাপদ সড়ক তৈরির পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সরকারের দিক থেকেও বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয় না।
প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে চলাচল করছে। তাই শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তাই সড়ক নিরাপত্তায় জনসম্পৃক্ততা ও জনগণকে কীভাবে দায়িত্বশীল করে তোলা যায় সেটিকেও প্রাধান্য দিতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা কেবল কাঠামোগত বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক ও আচরণগত বিষয়ও। নিয়ম না মানা, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, পথচারীর অসচেতনতা কিংবা মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতো অভ্যাস দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। নাগরিকদের এসব আচরণের পরিবর্তন না ঘটলে আইনের ফাঁক-ফোকরে তারা এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতেই থাকবে। ফলে সড়ক কখনই নিরাপদ হবে না। তাই নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে সরকার ও প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকের সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। এজন্য সরকারকে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকেও প্রাধান্য দিতে হবে। সর্বোপরি সরকারকে সড়কের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সড়কের পরিচালন কৌশল কী হলে তা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাবে তা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারের কার্যক্রমে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। জনগণকে নিজের জানমালের নিরাপত্তা বিবেচনায় বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তাতে সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দায় ও দায়িত্ব কমে যায় না।










