গ্রীষ্মের তীব্র রোদে শরীরের ঘামে যে পানির ঘাটতি তৈরি হয়, তা পূরণে আমরা প্রাকৃতিকভাবেই বেশি পানি পান করি। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে তাই বোতলজাত পানি একটি জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য পছন্দ হয়ে উঠেছে। নানা ধরনের কোমলপানীয় বাজারে সহজলভ্য হলেও ক্যালরিমুক্ত, নিরাপদ ও শরীরকে হাইড্রেটেড রাখার সহজ উপায় হিসেবে বোতলজাত পানিই বেশি গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশে এ পানির চাহিদা আরো বেশি। কারণ দেশের অনেক অঞ্চলে সরবরাহকৃত ট্যাপের পানি নিরাপদ নয়, ফলে বোতলজাত পানি একমাত্র নিরাপদ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বোতলে পানি ভরে বাজারজাত করলেই তা গ্রহণযোগ্য হবে না—প্রয়োজন মাইক্রোবায়োলজিক্যাল, ফিজিক্যাল, কেমিক্যাল ও রেডিওলজিক্যাল মানদণ্ড পূরণ করে সরকারের অনুমোদন পাওয়া। এ বোতলজাত পানি আবার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন: আর্টেসিয়ান পানি, যা চাপযুক্ত জলস্তর থেকে কূপের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়; মিনারেল পানি, যা সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আহরিত ও খনিজসমৃদ্ধ, তবে এতে বাইরে থেকে কোনো খনিজ যোগ করা যায় না; পিউরিফায়েড পানি, যা পাতন, ডি-আয়নাইজেশন বা রিভার্স অসমোসিসের মতো প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধ করা হয়; স্পার্কলিং পানি, যাতে উৎসে থাকা প্রাকৃতিক কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমান গ্যাস থাকে এবং স্প্রিং পানি, যা ভূগর্ভস্থ স্তর থেকে প্রাকৃতিকভাবে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে। এসব বৈচিত্র্যময় বোতলজাত পানি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্যকর পানীয়ের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্বব্যাপী বোতলজাত পানির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। গড় ব্যবহারের দিক থেকে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে রয়েছে, যেখানে প্রতি ব্যক্তি বছরে গড়ে যথাক্রমে ২৬৩ ও ১৯৬ লিটার বোতলজাত পানি পান করে। বাংলাদেশে এ হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম—প্রতি ব্যক্তি বছরে মাত্র ৩৯ লিটার। ২০২৫ সালে বিশ্বের বোতলজাত পানির মোট উৎপাদন যেখানে প্রায় ৪৮৫ বিলিয়ন লিটার হবে, সেখানে বাংলাদেশের উৎপাদন মাত্র ৭ বিলিয়ন লিটার বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সামান্য।
বর্তমানে খাবার পানিতে দ্রবীভূত জৈব পদার্থ একটি উদ্বেগজনক দূষণে পরিণত হয়েছে। এ দূষণ বলতে বোঝায় পানি বা অন্য কোনো দ্রবণে মিশে থাকা অতিক্ষুদ্র জৈব যৌগ বা উপাদান, যা সাধারণ ফিল্টারিং প্রক্রিয়ায় আলাদা করা সম্ভব নয়। পরিবেশবিজ্ঞানে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষ করে পানি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে। যা পানির নান্দনিকতা, ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে এবং পরিশোধন প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করে। ফলে পানিতে ক্ষতিকর রোগজীবাণুর সংক্রমণ বাড়ে এবং খাবার পানির গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রবীভূত জৈব পদার্থের উৎস মূলত মৃত ও জীবিত প্রাণী, জল ও স্থলজ উদ্ভিদ, মাটি, ক্ষুদ্র জীব, তাদের জৈব ক্ষয়প্রাপ্ত উপাদান এবং বিভিন্ন মানবসৃষ্ট উৎস থেকে আসে। দ্রবীভূত জৈব পদার্থের প্রধান উপাদানগুলো জীবিত অর্গানিজমের কার্বনভিত্তিক যৌগ, যা পানির রঙ, স্বাদ ও গন্ধ পরিবর্তনের জন্য দায়ী। এগুলো পানির মধ্যে এক ধরনের স্তর বা আবরণ সৃষ্টি করে, যা ক্ষুদ্র জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ও কার্যকলাপের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। ফলে এটি পানির গুণগত মানের অবনতি ঘটাতে পারে এবং পরিশোধন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
দ্রবীভূত জৈব পদার্থযুক্ত পানি পান করলে তা মানবদেহে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে ডিসেন্ট্রি, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, কলেরা, ক্রিপটোসপরিডিওসিস, বমি, বমি ভাব, মাথাব্যথা, অ্যামিবায়াসিস, অ্যানোরেক্সিয়া, পোলিও ও কোলাইটিসের মতো পানিবাহিত রোগের সৃষ্টি হয়। এটি পানিতে উপস্থিত থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে বিক্রিয়া করে একধরনের ক্ষতিকর যৌগ তৈরি করতে পারে, যা মূত্রাশয়ের ক্যান্সার ও গর্ভাবস্থায় জটিলতার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। শুধু আমেরিকায়ই পানিবাহিত রোগে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৬০০ জনের মৃত্যু ঘটে। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ পানির দূষণের কারণে মারা যায়, যার মধ্যে প্রায় ২২ লাখই শিশু। সব মিলিয়ে বিশ্বে বার্ষিক মৃত্যুর প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ পানিবাহিত রোগের কারণেই প্রাণ হারাচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বাংলাদেশে পানিবাহিত দূষণ ও এর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। অথচ পানিতে খনিজ উপাদানের মাত্রা, জীবন্ত অণুজীবের ঘনত্ব ও এসবের সঙ্গে সম্পর্কিত রোগ, অসুস্থতা ও মৃত্যুহার—এসবই বোতলজাত পানির গুণগত মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। ফলে এ বিষয়ে বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি। অতিরিক্তভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা আরো সংকুচিত হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান গবেষণায় বিভিন্ন দেশের বোতলজাত পানিতে বিদ্যমান দ্রবীভূত জৈব উপাদানের গঠনগত বৈশিষ্ট্য ও ঘনমাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং সেই ভিত্তিতে মাইক্রোবায়াল দূষণের সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রাও মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষণায় আরো বিশ্লেষণ করা হয়েছে—পানির উৎপাদন ও পরিশোধন পদ্ধতির দক্ষতা, অতিমাত্রায় খনিজ উপাদানের ক্ষতিকর প্রভাব এবং পানি পরিশোধনে ব্যবহৃত অর্থনৈতিক সূচকগুলোর কার্যকারিতা।
উপরোক্ত বাস্তবতা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে, বাংলাদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে ও অন্যান্য দেশ থেকে বোতলজাত পানির নমুনা সংগ্রহ করে ফ্লুরোসেন্স স্পেক্ট্রোস্কপি যন্ত্রের সাহায্যে দ্রবীভূত জৈব পদার্থের বৈশিষ্ট্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধীনে হাইড্রোবায়োজিওকেমিস্ট্রি ও পলিউশন কন্ট্রোল ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার জন্য বাংলাদেশসহ মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, জাপান ও নরওয়ে—এই নয় দেশের বাজার থেকে মোট ২৪টি বোতলজাত পানি সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার প্রাথমিক ধাপে এসব পানির ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য যেমন পিএইচ, তাপমাত্রা, পরিবাহিতা, দ্রবীভূত অক্সিজেন এবং টার্বিডিটি (অস্বচ্ছতা) পরিমাপ করা হয়।
বিশ্লেষণের ফলাফলে দেখা যায়, ৮৩ শতাংশ নমুনায় অণুজীব দ্বারা প্রক্রিয়াজাত টাইরোসিন ও ট্রিপ্টোফ্যান জাতীয় উপাদান শনাক্ত হয়েছে, যা বোতলজাত পানিতে নিয়মিত অণুজীব কার্যকলাপের উপস্থিতি নির্দেশ করে। আরো উদ্বেগজনক তথ্য হলো ৮৪ শতাংশ নমুনাই মাঝারি থেকে অত্যন্ত উচ্চঝুঁকির শ্রেণীভুক্ত হয়েছে, মূলত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কারণে। ভিয়েতনামের একটি ব্র্যান্ডের পানিতে অন্যান্য দেশের তুলনায় উচ্চমাত্রার হিউমিক পদার্থ পাওয়া গেছে, যা আর্সেনিকের সঙ্গে জটিল যৌগ গঠন করে ব্ল্যাকফুট ডিজিজ নামক রোগের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। ব্ল্যাকফুট ডিজিজ, বাংলায় যাকে বলা যেতে পারে “কালোপায়ের রোগ”, এটি একটি গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা, যা মূলত দীর্ঘ সময় ধরে আর্সেনিক-দূষিত পানি পান করার ফলে ঘটে। এ রোগ প্রথম শনাক্ত হয় তাইওয়ানের দক্ষিণাঞ্চলে, যেখানে বহু মানুষ ভূগর্ভস্থ জলে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে আর্সেনিক গ্রহণ করছিল।
বাংলাদেশের কিছু বোতলজাত পানিতে সিসা, অ্যালুমিনিয়াম ও ফসফেট গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় পাওয়া গেছে। এসব অতিমাত্রায় খনিজ উপাদান শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষয়, প্রজননক্ষমতা হ্রাস, আইকিউ কমে যাওয়া, রক্তকণিকা উৎপাদনে সমস্যা, স্মৃতিভ্রংশ, আলঝেইমার, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ায়—বিশেষত দ্রবীভূত জৈব পদার্থের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় জটিল যৌগ গঠন করলে। জাপানের ব্যতিক্রম বাদে, অন্যান্য দেশের বোতলজাত পানিতে দ্রবীভূত জৈব পদার্থযুক্ত এর মাত্রা ভূগর্ভস্থ পানি, মিঠাপানি ও সামুদ্রিক পানির দূষণের চেয়েও সমতুল্য বা বেশি পাওয়া গেছে, যা প্রচলিত পানি শোধন প্রযুক্তির অকার্যকারিতাকে নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় পানির নমুনা সংগ্রহ করা দেশগুলোর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বোঝা যায়, শুধু বাজেট বা শ্রম ব্যয়ের বিষয় নয়, বরং পানি শোধন প্রযুক্তি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা ও মানসিক প্রস্তুতিও নিরাপদ পানির মান নিশ্চিতকরণে বড় ভূমিকা রাখে।
এ পরিস্থিতিতে পানির মান নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী তদারকি, আধুনিক ও কার্যকর পরিশোধন প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত পানির নমুনা বিশ্লেষণ এবং সর্বোপরি, নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা ও জনগণের সচেতনতা। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। যদিও দেশে বোতলজাত পানির গুণগত মান নির্ধারণ ও তদারকির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। তথাপি এর বাস্তবায়ন এখনো সন্তোষজনক নয়। পানির মান নির্ধারণে সরকারি সংস্থা নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করেছে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—বাজারে অনুমোদনহীন ও নকল ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানি সহজলভ্যভাবে বিক্রি হচ্ছে। এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মাঝে মাঝে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও তা নিয়মিত ও পরিকল্পিত না হওয়ায় অসাধু উৎপাদকরা বারবার নিম্নমানের পানি বাজারজাত করতে পারছে। এমনকি অনেক কোম্পানি অনুমতি নবায়ন ছাড়াই বছরের পর বছর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক গবেষণার আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়—নিরাপদ, মানসম্মত ও স্বাস্থ্যকর পানির নিশ্চয়তায় প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা, এর যথাযথ প্রয়োগ ও টেকসই তদারক ব্যবস্থার সংহত উদ্যোগ। শুধু তখনই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। বাস্তবতা হলো অনেক বোতলজাত পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের গায়ে ‘মিনারেল ওয়াটার’, ‘সেফ ওয়াটার’ বা ‘অর্গানিক’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করে প্রচার চালায়, যার পেছনে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রায়ই অনুপস্থিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো সাধারণ কলের পানি, যা সামান্য পরিশোধনের পর বোতলে ভরে বাজারজাত করা হয়। ভোক্তারা বোতলের গায়ে থাকা তথ্যকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে গ্রহণ করেন এবং বিজ্ঞাপনকেই সত্য মনে করে পান করেন। ফলে ভুল বা বিভ্রান্তিকর লেবেল ভোক্তাকে প্রতারিত করে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করে। এ প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানভিত্তিক, বাধ্যতামূলক ও যাচাইকৃত লেবেলিং প্রথা চালু করা অত্যন্ত জরুরি, যেন প্রতিটি বোতলের উৎস, পরিশোধন পদ্ধতি ও মান নিয়ন্ত্রণের তথ্য সহজেই জানার উপায় থাকে।
বোতলজাত পানির মান নিয়ে ভাবার সময় আমরা প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—এর প্যাকেজিং উপাদান—উপেক্ষা করে থাকি। অধিকাংশ বোতল প্লাস্টিকজাত, যা দীর্ঘক্ষণ সূর্যের আলো বা তাপের সংস্পর্শে থাকলে মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এসব প্লাস্টিক থেকে ‘বিসফেনল-এ’ বা মাইক্রোপ্লাস্টিক জাতীয় উপাদান পানিতে মিশে যেতে পারে, যা মানবদেহে প্রবেশ করে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট, প্রজননক্ষমতা হ্রাস, শিশুদের মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি পর্যন্ত বাড়াতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোয় দেখা গেছে, বাজারের অনেক বোতলজাত পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে—যা অদৃশ্য হলেও স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করে। এ অবস্থায় শুধু পানি নয়, বোতলের মান এবং সংরক্ষণের শর্তও সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা জরুরি।
পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়—সচেতন ভোক্তা হিসেবেও আমাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উচিত প্রতিটি বোতলের লেবেল, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ, সিলিং এবং স্বচ্ছতার দিকগুলো খেয়াল রাখা। যদি বোতল ঝাঁকালে অস্বাভাবিক ফেনা ওঠে, কিংবা পানির রঙ, গন্ধ বা স্বাদে পার্থক্য থাকে, তাহলে তা সঙ্গে সঙ্গে বর্জন করা উচিত। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পানির জন্য নিজ ঘরে আধুনিক ফিল্টার প্রযুক্তি যেমন রিভার্স অসমোসিস বা ফিল্টার ব্যবহার করা যেতে পারে। সচেতন ভোক্তারাই শেষ পর্যন্ত বাজারে গুণগতমান নিশ্চিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। উন্নত দেশগুলো এ বিষয়ে এরই মধ্যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে—যেমন জাপানে প্রতিটি বোতলের গায়ে কিউআর কোড যুক্ত থাকে, যা স্ক্যান করে ভোক্তা জানতে পারে পানি সংগ্রহের উৎস, পরিশোধন পদ্ধতি এবং পরীক্ষার ফলাফল। ইউরোপীয় দেশগুলোয় প্রতি বছর বাধ্যতামূলক মান যাচাই রিপোর্ট জমা দিতে হয় এবং তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। বাংলাদেশেও এমন প্রযুক্তিনির্ভর, নিয়মিত ও স্বচ্ছ তদারকি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
সবশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে—পানি কেবল তৃষ্ণা মেটানোর উপকরণ নয়, জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান। বোতলজাত পানি দেখতে যতই স্বচ্ছ বা ঠাণ্ডা হোক না কেন, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাই পানির গুণগত মান, পরিশোধন পদ্ধতি এবং প্যাকেজিং উপাদানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই জরুরি। সরকার, উৎপাদক এবং ভোক্তা সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা সম্ভব। আর একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের শুরু হয় একটি নিরাপদ পানির গ্লাস দিয়েই।
ড. শফি মুহাম্মদ তারেক: অধ্যাপক, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; ফেলো, রয়্যাল কেমিক্যাল সোসাইটি এবং চার্টার্ড পরিবেশবিদ, যুক্তরাজ্য










