রাজধানী ঢাকায় পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। উন্নয়ন, অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রকের বিশাল দায়িত্ব এড়িয়ে সংস্থাটি ঘুস, দুর্নীতিতে জড়িয়ে ঢাকাকে বিপজ্জনক নগরীতে পরিণত করেছে। ভবন নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়াদিও দেখভাল করার বিষয়ে তাদের কোনো রকম তদারকি নেই, ত্রুটি-বিচ্যুতি খুঁজে দেখার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা নেই। যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হয় তাদের কাজই দ্রুতগতিতে হয়। এ বিশৃঙ্খলার ফলে রাজধানীবাসীর জীবনযাত্রার মান শুধু নিম্নগামীই হয়নি, অনিরাপদও হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে জীবনযাপন। ঝুঁকির মাত্রা কত উচ্চ, তা উপলব্ধি করা যায় যখন কোনো দুর্ঘটনায় একসঙ্গে অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কাজ হচ্ছে ঘুস ও হয়রানিমুক্ত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘুস ও হয়রানি ছাড়া কোনো কাজই হয় না। রাজউকের সেবা মানেই যেন নাগরিক দুর্ভোগের আরেক নাম ঘুস, অনিয়ম ও টেবিল ঘোরার যন্ত্রণা। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই রয়েছে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রতিষ্ঠানটি এখনো জনবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। হয়রানি ও ঘুস-দুর্নীতি বন্ধ করে রাজউকের সেবায় স্বচ্ছতা আনতে গেলে দরকার জবাবদিহিমূলক কাঠামো নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সব ধরনের সেবাকে ডিজিটাল করা। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন—এখন হয়তো অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হবে, ঘুস ছাড়া নিশ্চিত হবে সেবা এবং রাজউক জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই পুরনো চিত্রই এখনো বিরাজমান। অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের বিভিন্ন শাখায় এখনো ঘুস ছাড়া কোনো কাজ এগোয় না। নকশা অনুমোদন কিংবা ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র—সবখানেই চলছে দালাল চক্র ও এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে অনিয়ম-দুর্নীতি।
রাজউকের যেসব সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারি, হস্তান্তর বা দান বণ্টন সূত্রে নামজারি, প্লট হস্তান্তর/দানপত্র/হেবা দলিল/বণ্টন দলিল রেজিস্ট্রি অনুমতি, ফ্ল্যাট হস্তান্তর/দানপত্র বণ্টনের অনুমতি, প্লট বা ফ্ল্যাটের আমমোক্তারনামা অনুমোদন ও অনুমতি বাতিল, উত্তরাধিকার সূত্রে সংশোধিত বরাদ্দপত্র, প্লটের কোনো মূল কাগজ/ডকুমেন্টস হারানো গেলে সত্যায়িত কপি সরবরাহ করা, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদনের ছাড়পত্র, ইমারত নির্মাণ অনুমোদনপত্র, বসবাস ব্যবহার সনদ ইত্যাদি। বিশেষ করে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।
রাজধানী ঢাকার বসবাসযোগ্যতা রক্ষায় এবং নীতিনির্ধারিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজউকের বড় ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংস্থাটির দাপ্তরিক দুর্বলতা ও স্বচ্ছতার অভাব রাজধানীবাসীর জীবনকে করে তুলেছে আরো দুর্বিষহ। নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেবাপ্রাপ্তিতে জটিলতা দূর না হলে এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো না গড়ে উঠলে রাজউক কখনই একটি দক্ষ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে না। এখন সময় এসেছে দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ, ডিজিটাল সেবায় আরো স্বচ্ছতা আনার। রাজউকের সেবা অনলাইন করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সেবা সহজ করা ও ঘুস-দুর্নীতি বন্ধ করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ডিজিটাল প্লাটফর্মের অন্তরালে দুর্নীতির প্রবাহ আগের চেয়েও সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিত রূপে বহাল রয়েছে। নকশা অনলাইনে জমা দিলেও তা অজানা কারণে বাতিল করে দেয়া হচ্ছে। অথচ কেন তা বাতিল হলো সেই কারণ জানানো হচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা বাধ্য হন সরাসরি দপ্তরে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, যেখানে ঘুস ছাড়া কোনো সেবা পাওয়ার নজির নেই।
জনভারে নুয়ে পড়া ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে রাজউক প্রণয়ন করেছে নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২-৩৫। এটি কার্যকর হয় ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে। এর আওতায় ঢাকা মহানগর ও আশপাশের মোট ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে পরিকল্পনাটি শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়ে। ড্যাপ গেজেট হওয়ার পর পরই নগরবাসী পড়েছেন তীব্র ভোগান্তিতে। সরকারের দৃঢ় সিদ্ধান্তের অভাবে নগরীতে নির্মাণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, প্লট মালিকরা জমি ব্যবহার করছেন না। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন না হলেও খুলে গেছে অনিয়ম-দুর্নীতির নতুন দুয়ার। অভিযোগ উঠেছে, আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে ঘুস দিয়ে ব্যাক ডেটে ভবন অনুমোদন করানো হচ্ছে। এরই মধ্যে ড্যাপের কিছু জায়গায় ছাড় দিয়ে একবার গেজেট হয়েছে। সর্বশেষ ড্যাপ আবার সংশোধনের জন্য মন্ত্রণালয়ে আছে, যা সরকারের নগর দর্শনকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
রাজউককে দুর্নীতিমুক্ত ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এর কাঠামোতে মৌলিক সংস্কার জরুরি। প্রথমত, সেবার ডিজিটাল ব্যবস্থাকে বাস্তব অর্থে কার্যকর করতে হবে, যাতে আবেদন থেকে শুরু করে অনুমোদন ও ফিডব্যাক—সবকিছুই অনলাইনে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন হয়। বর্তমানে যে অনলাইন প্রক্রিয়া রয়েছে সেটি অত্যন্ত দুর্বল। তাই স্বচ্ছ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করে আবেদন প্রত্যাখ্যানের কারণ স্পষ্টভাবে জানানো বাধ্যতামূলক করা উচিত।
এছাড়া দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমিয়ে সেবাপ্রার্থীদের সরাসরি সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ঘুস বা হয়রানির অভিযোগ জানানোর জন্য নির্ভরযোগ্য হেল্পলাইন ও অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করা দরকার। একই সঙ্গে রাজউকের জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতা প্রাধান্য পেতে হবে, যাতে পেশাদারত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। দুর্নীতিরোধে অভ্যন্তরীণ অডিট টিম গঠন এবং নিয়মিত তদারকি জরুরি, যেখানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
রাজউকের নীতিনির্ধারণী ও পরিকল্পনা পর্যায়ে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও নাগরিক প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে সেবাকে আরো জনমুখী ও বাস্তবধর্মী করা যেতে পারে। রাজউককে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তর করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বিকল্প নেই। শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন নীতিগত স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি।










