বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীর তালিকার শীর্ষে দীর্ঘকাল ধরেই রয়েছে বুড়িগঙ্গার নাম। অথচ এক সময় এ নদী স্বচ্ছ জলরাশিতে পূর্ণ ছিল। ছিল উত্তাল ও প্রশস্ত এক নদী। বিশ্বব্যাপী নদীতীরে গড়ে ওঠা নগরীর মতো এর তীরেও ৪০০ বছর আগে গোড়াপত্তন হয়েছিল আজকের ঢাকার। একটা সময় এ বুড়িগঙ্গা ছিল ঢাকার বাণিজ্য ও যোগাযোগের প্রধান রুট। এমনকি নব্বইয়ের দশকেও বুড়িগঙ্গার কোনো কোনো অংশের পানি পানযোগ্য ছিল বলে জানা যায়।

সেই নদী ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনসহ নানা কারণে কালক্রমে তার জৌলুস হারিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, প্রতিদিন শহরের ৬০ হাজার ঘনমিটারেরও বেশি বিষাক্ত বর্জ্য এ নদীর পানিতে ফেলা হয়। বুড়িগঙ্গা আজ এতটাই দূষিত যে এটি বর্তমানে কালো পানি আর উৎকট গন্ধের এক নদীর রূপ পরিগ্রহ করেছে।

দুঃখজনকভাবে এ দেশের অসংখ্য নদীর অবস্থা বর্তমান বুড়িগঙ্গার মতোই। দখল-দূষণের কবলে পড়ে অসংখ্য নদী হয় জৌলুস হারিয়েছে কিংবা বর্জ্যের ভারে অস্তিত্ব হারিয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে হয়তো এসব নদী রক্ষা করা যেত। কিন্তু তেমন নদীবান্ধব সরকার এখানে গঠন হতে দেখা যায়নি।

নদীগুলোর এমন বেহাল দশা যখন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি নদী দখল-দূষণমুক্তির ঘোষণা আশা সঞ্চার করে। সম্প্রতি সেই ধারাবাহিকতায় ৬২ জেলা থেকে ৬২টি নদী নির্বাচন করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, জেলা প্রশাসকদের দেয়া সময় অনুযায়ী সব জেলার একটি করে নদী দূষণমুক্ত করতে সময় লাগবে ১৬ দিন থেকে সর্বোচ্চ এক বছর তিন মাস। আর এগুলোর পরে ধীরে ধীরে দেশের সব নদ-নদী দূষণমুক্ত করা হবে।

৬২টি নদী দূষণমুক্তির উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে পুরোপুরি আশ্বস্ত হওয়া মুশকিল। প্রত্যাশা রয়েছে, এ তালিকাভুক্ত নদীগুলো দখল-দূষণমুক্তির কথা কেবল তালিকায় রয়ে যাবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হতে হবে। তবেই এ দেশ একটি নদীবান্ধব সরকার পেয়েছে বলে দাবি করা যাবে।

নদ-নদী রক্ষায় বিগত সব সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে সেগুলো সর্বদা কাগজে লিপিবদ্ধ হয়েই থেকে গেছে। নদী বাঁচাতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। এর পরের বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠন হয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)। মূলত দেশের নদ-নদীর দখল-দূষণ রোধের পাশাপাশি স্বাভাবিক নাব্যতা বজায় রাখার দায়িত্ব এনআরসিসির। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যায়। যে কারণে বেশির ভাগ নদীই দখল-দূষণে আজ মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। কতগুলো পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে, আর কতগুলো বিলীন হয়ে গেছে সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। অবশ্য যেখানে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা কত সেটিই আজও অজানা, সেখানে কতগুলো নদী দখল-দূষণের শিকার তা জানা সম্ভব কি! দেশের নদীর সঠিক সংখ্যা নিয়ে আজও কেউ বা কোনো প্রতিষ্ঠান ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। নদ-নদীর চূড়ান্ত সংখ্যা বের করার দায়িত্বও এনআরসিসির। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তালিকা সঠিক নয় বলে বারবার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞ মহল থেকে।

দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে ২০১৯ সালে তালিকা প্রণয়ন শুরু করে এনআরসিসি। প্রায় চার বছর কাজ শেষে ২০২৩ সালের আগস্টে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ৯০৭টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ হয়। এ সংখ্যা নিয়ে সে সময়ই প্রশ্ন তোলেন নদী গবেষকরা। এমনকি সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য সংস্থার প্রকাশিত নদ-নদীর তথ্যের সঙ্গেও এনআরসিসির খসড়ার তথ্যের গরমিল ছিল। পরবর্তী সময়ে নদ-নদীর তালিকার ওপর মতামত ও আপত্তি আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেয় কমিশন। ওইসব মতামত ও আপত্তি নিষ্পত্তি করে ১ হাজার ৮টি নদীর তালিকা প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। তার পরও কিছু আপত্তি রয়েই যায়। বস্তুত দেশে নদ-নদীর সংখ্যা কত এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। তবে নদী গবেষকদের দাবি, দেশে নদ-নদী রয়েছে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি।

তবে প্রকৃত সংখ্যা যেটিই হোক না কেন, দখল-দূষণ এখানে এতই স্পষ্ট যে তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

যুগের পর যুগ ধরে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী এ কাজ করে আসছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলসংশ্লিষ্ট ও এলাকার প্রভাবশালীরা এ কাজে জড়িত। দেশের প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের অসংখ্য শাখা বছরের পর বছর ধরে অবৈধ দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। অবৈধভাবে দখল করে সেসব স্থানে জনবসতিসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি বসতি গড়ে ওঠায় সেখানে যে এক সময় নদী ছিল, সেটিও বোঝার উপায় নেই। অথচ আমাদের দেশের ভৌগোলিক গঠন ও ধরন অনুযায়ী নদীই হচ্ছে প্রাণ ও প্রকৃতি সজীব রাখার মূল উৎস। আবহমানকাল থেকে এ দেশের কৃষি-মৎস্য খাত থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদ-নদী। যে কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করেছে ‘নদীমাতৃক দেশ’ হিসেবে। অথচ দখল-দূষণে নদীর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। এতে যেমন দেশে পানি সংকট দেখা দিচ্ছে, তেমনি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশ সজীবতা হারাচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এ অবস্থা থেকে নদীগুলোর পুনরুদ্ধারে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এজন্য বর্তমান সরকারকে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার পথে হাঁটতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কারণ নদী রক্ষা করতে হলে কেবল একবার এটিকে দখল-দূষণমুক্ত করলেই চলবে না। এজন্য সর্বদা কড়া নজরদারি প্রয়োজন।

অভ্যুত্থানের মুখে বিগত সরকার পতনের পর কমিশনটি একেবারেই অকার্যকর হয়ে আছে। এটিকে নতুনভাবে সাজানো এখন সময়ের দাবি। যদিও বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসেও নতুন কমিশন গঠন হয়নি, যেটি হতাশাব্যঞ্জক। এর আগেও বিষয়টি নিয়ে বণিক বার্তায় আলোকপাত করা হয়েছে। আবারো জোর দিয়ে বলতে চাই, দেশের নদ-নদী রক্ষায় শক্তিশালী কমিশন গঠন করা দরকার। সরকার যদি প্রকৃতপক্ষে টেকসই পদ্ধতিতে নদী রক্ষা করতে চায় তবে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। যে কমিশন দখল-দূষণমুক্ত নদীগুলোয় পুনরায় পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা করবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করে নাব্যতা ফেরানোয় কাজ করবে এবং সর্বোপরি নদ-নদীর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা হবে।

সব নদী যদি হারানো স্বচ্ছ জল ও গতি ফিরে পায় এবং তা অব্যাহত থাকে তবেই অন্তর্বর্তী সরকারের এ উদ্যোগকে পুরোপুরি সফল বলা যাবে।