অন্তর্বর্তী সরকার গত ৮ আগস্ট দায়িত্ব নিয়েছে দেশের বিভিন্ন খাত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এর মধ্যে প্রধানতম অর্থনীতির সংস্কার। তবে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করতে না পারলে অর্থনৈতিক খাতের সংস্কার করা কঠিন হবে। কারণ বর্তমানে দেশের অর্থনীতির যে গভীর ক্ষত তার পেছনে দায়ী এর ব্যাপকমাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ।

বিগত সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে দেখা গেছে, সেই সরকারের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নির্ভয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে গেছে, যার দরুন দেশের প্রায় সব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আর্থিক ও ব্যাংক খাতের, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে এ খাত। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে প্রভাবশালী ও ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সর্বেসর্বা হয়ে দুর্নীতি ও লুটপাট করেছেন। আইন না মেনে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশেষ গোষ্ঠীকে ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণে জর্জরিত করেছে। মুষ্টিমেয় ব্যক্তির হাতে ব্যাংকগুলো জিম্মি থেকেছে, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে তাদের সুবিধা দিতে গিয়েই দীর্ঘদিন সুদহার ছয়-নয়ে আটকে রাখা হয়েছিল, যা বাজার অর্থনীতির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ছিল। পাশাপাশি ঋণ আদায়কে গুরুত্ব না দিয়ে বারবার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া হয়েছে সুবিধাভোগীদের। এর মধ্য দিয়ে ব্যাংক খাত গভীর সংকটের দিকে গিয়েছে।

আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে লিপ্ত হয়েছেন সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতিতে। এমনকি পতিত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও কর্তাব্যক্তিরাও নানা দুর্নীতি-অনিয়ম ও অর্থ পাচারে লিপ্ত হয়েছেন। দেশের আমলাতন্ত্র হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ পৃষ্ঠপোষক। জনসেবা থেকে আমলাদের যোজন যোজন দূরত্বে থাকতে দেখা গেছে। যে দেশের সব প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিকীকরণের শিকার হয়, সে দেশের যেকোনো সংস্কার সর্বপ্রথম রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি রাখে, যে রাজনীতি অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। একই সঙ্গে দেশের সব খাতকে স্বাধীনভাবে পরিচালনের সুযোগ তৈরি করবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কখনই সংস্কার সম্ভব নয়, অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। কারণ রাজনীতিবিদদের হাতে মোটাদাগে রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের ক্ষমতা থাকে। তাই তাদের চাওয়াটাই মুখ্য ভূমিকা পালন করবে এক্ষেত্রে। এজন্য সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ আবশ্যক।

সম্প্রতি এ কথাগুলো আরো জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের অষ্টম বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে অংশ নেয়া অর্থনীতিবিদরা। সেখানে বক্তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কায়েমি ও স্বার্থবাদী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে অর্থনৈতিক সংস্কার হতে দেয় না।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের বাইরে অর্থনীতির অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ চীন। একাধিক দেশের সঙ্গে দেশটির সীমান্ত বিরোধ থাকলেও সেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও রয়েছে। কারণ চীনের নীতিতে অর্থনীতি মুখ্য, যেটি বাংলাদেশে অনুপস্থিত।

এ দেশে পরিসংখ্যানও রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বিগত সরকারের আমলে। অথচ জাতীয় অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণে সঠিক নীতির প্রয়োজনীয় অনস্বীকার্য। বিদেশ থেকে বেশি ঋণ নেয়ার পাশাপাশি জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাতের পরিসংখ্যানে কারসাজি করা হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণ ও উন্নয়নকে অতিরঞ্জিত করে দেখাতে জিডিপিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। এছাড়া অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক রফতানি বাণিজ্য, রিজার্ভ, রাজস্ব আহরণ ইত্যাদি সব বিষয়ের তথ্যে রয়েছে বড় ধরনের গরমিল। যে কারণে সংকটে থাকা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গৃহীত কোনো নীতিই বিগত বছরগুলোয় সেভাবে কাজ করেনি। ফলে সমসাময়িক প্রতিযোগী অর্থনীতিগুলোর তুলনায় বিনিয়োগ, রফতানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদেশী বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশসহ বিভিন্ন সূচকেই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সঠিক তথ্যের অভাবে চাহিদা ও বাজার নিয়ন্ত্রণসহ অর্থনীতির ব্যবস্থাপনাগত সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ত্রুটি রয়ে গেছে।

তবু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অর্থনীতিতে কিছুটা গতি এসেছে। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের যে জায়গা—মূল্যস্ফীতি—তা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেনি এখনো। আবার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ কমায় কর্মসংস্থান বাড়েনি। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বেকারত্বের মাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। প্রথম চার মাসে সার্বিকভাবে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ১৮ শতাংশ। এ সময়ে উন্নয়ন ব্যয় রেকর্ড পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পরিকল্পনা বিভাগের পর্যবেক্ষণ, বাজেট বাস্তবায়নের হার এত নিম্ন পর্যায়ে থাকলে আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।

এদিকে জনপ্রসাশন সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে বর্তমান সরকার ব্যাপক রদবদল করেছে প্রশাসনে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে প্রশাসন ক্যাডারের একটি নির্দিষ্ট ব্যাচের কর্মকর্তারাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। এসব ঘিরে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা আবারো এক ধরনের রাজনৈতিকীকরণের ইঙ্গিত দেয় এবং অর্থনৈতিক সংস্কার গৌণ হয়ে ওঠার শঙ্কা তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের প্রয়োজন অর্থনীতিকে যেকোনো উপায়ে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখা। গোষ্ঠীতেন্ত্রের লাগাম টেনে ধরা। এজন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা আবশ্যক।

ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া দলগুলো এবং সরকার জাতীয় ঐকমত্যের কথা বললেও এখনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। আবার সরকারের কাজে গতিহীনতার জন্য একাধিক উপদেষ্টাসহ অনেকেই দায়ী করছেন জনপ্রশাসনের স্থবিরতাকে। গত ছয় মাসে অন্তত দেড় শতাধিক আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয়েছে সরকারকে। যৌক্তিক-অযৌক্তিক দাবি নিয়ে সড়ক বন্ধ করে আন্দোলন সাধারণ মানুষকে ভোগালেও তা নিরসনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। আবার অনেক সিদ্ধান্ত এতটাই অনভিপ্রেতভাবে নেয়া হয়েছে, যা বিশৃঙ্খলা বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে আর্থিক সংস্কারের গতি ধীর হয়ে এসেছে। সুতরাং সর্বাগ্রে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও গোষ্ঠীতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ জরুরি, যা কূটনীতিক সমীকরণকে পাশে রেখে, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে বেগবান করবে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে।