দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, ধর্ষণ, নির্যাতন, খুন, অপহরণ, রাহাজানি ও কিশোর গ্যাং জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এমনকি দিনদুপুরেও বিভিন্ন যানবাহনে ছিনতাই হচ্ছে অভিনব কায়দায়। ছিনতাইকালে আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করছে ছিনতাইকারীরা। এসব অপরাধ দমনে সরকার চরম দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ছয় মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের। এখনো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। শিক্ষার্থী, পেশাজীবী সংগঠন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ রিকশাচালকরা বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অবরোধ করছে। এতে পুরো রাজধানীই তীব্র যানজটের শিকার হচ্ছে। এছাড়া যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশে তৎপরতা তেমন লক্ষ করা যাচ্ছে না। গাবতলীসহ রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানজট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কর্মজীবী মানুষকে তার গন্তব্যে পৌঁছতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে (বিদেশী বিনিয়োগসহ) নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দেশের সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানসহ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সরকারকে দ্রুত দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
সম্প্রতি দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে নয়টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটি। আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তল্লাশিচৌকি এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহল বাড়ানোসহ এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে। কথা হচ্ছে, শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর হতে হবে। অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো তো বটেই, অলিগলিতেও হরদম ছিনতাই হচ্ছে। শুধু ঢাকায়ই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানির ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। এসব অপকর্ম করছে মূলত জেলফেরত আসামিসহ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। রাজধানীর অলিগলির ছিনতাইকারীদের এলাকার অনেকেই চেনে, তারা এলাকারই বাসিন্দা। তার পরও তাদের বাধা দেয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে ছিনতাইকারীদের দমানো যাচ্ছে না। সেনাবাহিনীর তৎপরতায় যদিও-বা কোথাও কোথাও ছিনতাইকারীদের উপদ্রব কমে; কিন্তু সুযোগ পেলেই তারা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। অবস্থা এখন এমন যে নগরবাসী রাস্তায় বেরোলেই সর্বক্ষণ ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন কখন তারা ছিনতাইয়ের শিকার হন। অপরাধীরা শুধু জিনিপত্র বা সম্পদই লুট করছে না, আগ্নেয়াস্ত্র কিংবা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভুক্তভোগীকে আহতও করছে। জানমালের নিরাপত্তা এভাবে হুমকিতে পড়া স্বভাবতই গ্রহণযোগ্য নয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবার ওপরই যে এর দায় বর্তায়, তা বলাই বাহুল্য। জনগণের করের টাকায় বেতনভুক্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং সমাজে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখবে—এটাই প্রত্যাশিত।
গত ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে গত সরকারের পতন হয়। এর পর থেকেই লক্ষ করা যাচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। যেকোনো দেশেই গণ-অভ্যুত্থান হওয়ার পর কিছুদিনের জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ঘটতে থাকে। কিন্তু এ দেশে ছয় মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও কেন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি ঘটছে—এ প্রশ্নের সদুত্তর না মিললে জনমনে আতঙ্কের পাশাপাশি আস্থাহীনতা দেখা দেবে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় রামদা দিয়ে দুই নরনারীকে কোপানোর ভয়াল দৃশ্যের জের কাটতে না কাটতেই দিনদুপুরে যাত্রীবাহী বাসে প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। রাতেও দূরপাল্লার বাসে সর্বস্ব লুটের ঘটনা ঘটছে। চাঁদা না দেয়ায় চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীকে কোপানোর ঘটনাও বুঝিয়ে দিচ্ছে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, কিশোর গ্যাংদের নৈরাজ্য কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। কিশোর গ্যাংসহ নানা শ্রেণীর অপরাধীরা যেভাবে দাপটের সঙ্গে অস্ত্র ব্যবহার করছে, তাতে দেশবাসীর নিরাপত্তা যে সংকটে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রবাজির পেছনে বিগত জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্র লুটেরাদের ভূমিকা রয়েছে। জেল পালানো ও জামিন নিয়ে বেমালুম বের হয়ে যাওয়া বড় অপরাধীরাও তাদের পুরনো কর্মে ফিরে গেছে। কাজেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি না পেলে যে এ পরিস্থিতির অবনতি বৈ উন্নতি হবে না, তা বলাই বাহুল্য।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি দিনভর রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এদিন রাতেই রাজধানীর বনশ্রীতে দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গুলি করে স্বর্ণ ও টাকা লুট করে নেয়ার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে এ ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১টার দিকে মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সেখানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। পরদিন সোমবার সকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যরাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। যদিও সেখানে তিনি অতীতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের মতো বিরোধীদের ওপর দায় চাপানো তথা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বাইরে বের হতে পারেননি। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের দোসররা পাচার করা টাকা এনে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। যারা এ ধরনের কাজ করছে তাদের ঘুম হারাম করে দেয়া হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যদি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তাদেরকেও শাস্তির আওতা আনা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি আশ্বস্ত করেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে। প্রশ্ন হলো, এ কথা বলতে তাকে ছয় মাস অপেক্ষা করতে হলো কেন? বর্তমানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বিভিন্ন থানা পরিদর্শনে যাচ্ছেন। তবে অভিযানে গিয়ে পুলিশও হামলার শিকার হচ্ছে। যেখানে পুলিশই নিরাপদ নয়, সেখানে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? তাই আগে পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।
বাস্তবতা হলো, যখন কোনো দেশ একটি অন্তর্বর্তী বা অস্থির সময় পার করে, একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। বলা হচ্ছে, এতদিন যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি করত, তাদের সেসব অবৈধ আয় বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং টাকা উপার্জনের পথ হিসেবে তারা ছিনতাইকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। আবার বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য দেশে-বিদেশে যে ষড়যন্ত্র চলছে, তারাও নানাভাবে খেলতে পারে। অর্থাৎ অনেক কিছুই হতে পারে। যেকোনো কারণেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সেখানে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। স্যাবোটাজ হতে পারে। এমনকি নতুন কোনো প্লট তৈরির জন্যও পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের মনে নিরাপত্তার বোধ তৈরি করা। কিন্তু মুশকিল হলো, অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই এ কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে,৷ ছয় মাসেও তারা মব থামাতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন থানায় এখনো পুলিশ নিরাপদ নয়। পুলিশই যদি নিরাপদ না হন তারা জনগণের নিরাপত্তায় কীভাবে কাজ করবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অতি দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো জরুরি। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাস ও কার্যক্রম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।










