চা শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বর্তমানে দেশে চায়ের বার্ষিক চাহিদা সাড়ে আট কোটি থেকে নয় কোটি কেজির মধ্যে। দেশে বছরে ১০ কোটি কেজির বেশি চা উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি বছর বিক্রি হওয়া (শুল্ক-কর ব্যতীত) চায়ের মূল্য ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে চা। পাটের পরই চা হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি ফসল। চা শিল্প দেশের জিডিপিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। দেশে বর্তমানে ২ দশমিক ৮ লাখ একরেরও বেশি জায়গায় ১৭০ চা বাগান আছে। এ শিল্পের ওপর নির্ভর করছে সরাসরি দেড় লাখ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা। কিন্তু বর্তমানে দেশের চা খাত বহুর্মুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লোকসানের কারণে নগদ অর্থের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি পরিশোধে অক্ষমতা ও ঋণপ্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা—সব মিলিয়ে চা বাগানগুলোকে বড় সংকটে ফেলেছে। অর্থ সংকটের কারণে দেশের ৩১টি বাগান মালিক শ্রমিকদের মজুরিসহ বিভিন্ন সুবিধা দিতে পারছে না। এরই মধ্যে পাঁচটি বাগান তাদের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ঋণপ্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণসহ চা শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দরকার।

বর্তমানে চা বাগানগুলো যে সংকটে পড়েছে তার মূল কারণ হচ্ছে উৎপাদন ব্যয় ও বিপণন মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। নিলামনির্ভর বিপণন ব্যবস্থায় উৎপাদকরা নিজের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না। ফলে ২০১৮ সালের পর থেকে চা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তারা লোকসানে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ঋণপ্রাপ্তিসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং লেনদেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং (আইসিআরআর) চা খাতে আরোপ করায় উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু উদ্যোক্তরা জানিয়েছেন, দেশের চা খাতের উদ্যোক্তাদের খেলাপি ঋণ মাত্র ১০ কোটি টাকার মতো। অথচ অপরাপর শিল্প ও উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানে কড়াকড়ি আরোপের নিয়মটি চায়ের মতো নিরাপদ খাতেও আরোপ হওয়ায় সংকটে পড়েছেন তারা। চা শিল্পের জন্য শস্য বন্ধকি ঋণ, প্রণোদনা প্যাকেজ ঋণ, অন্যান্য ঋণ এবং ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ ও পুনর্গঠনের ওপর থেকে আইসিআরআর বাধ্যবাধকতা শিথিল করে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা উচিত। আইসিআরআর বাধ্যবাধকতা শিথিল করা না হলে অর্থ সংকটে চা উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা ব্যাহত হবে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে চা খাতের এসব সংকট নিরসনে নিয়ম শিথিলের পাশাপাশি আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন, সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ফান্ড প্রদানেরও প্রস্তাব দিয়েছেন চা বাগান মালিকরা। চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের প্রস্তাবকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

দেশে এক দশক ধরে ক্রমাগত চায়ের উৎপাদন খরচ বাড়লেও নিলামে বিক্রয়মূল্য আশানুরূপ বাড়ছে না। ২০২৪ সালে চায়ের বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রথমবারের মতো ন্যূনতম মূল্যস্তর বসানো হয়। এতেও চায়ের উৎপাদন খরচ উঠছে না। এরপর চলতি বছরের কেজিপ্রতি চায়ের মূল্য বাড়ানো হলেও উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না অনেক বাগান। উৎপাদন ব্যয় ও বিপণন মূল্যের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে বাজার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা জরুরি। বাজারে একটি স্থিতিশীল ও লাভজনক মূল্য কাঠামো গড়ে তোলা দরকার।

চা খাত কৃষি ও শিল্প উভয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। উৎপাদন পর্যায়ে এটি কৃষিভিত্তিক হলেও চা পাতা প্রক্রিয়াকরণ শিল্প প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। এ দ্বৈত প্রকৃতির কারণে চা খাত, কৃষি ঋণের সহজ সুবিধাও পাচ্ছে না, আবার শিল্প ঋণের কঠিন শর্তও পূরণ করতে পারছে না। নানাবিধ সংকটের কারণে উচ্চ সুদে (১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত) ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করাও সম্ভব হচ্ছে না। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রথমত চা শিল্পকে একটি বিশেষায়িত খাত হিসেবে নীতিগত স্বীকৃতি দেয়া উচিত। যেমন কৃষির ক্ষেত্রে রয়েছে রেয়াতি সুদের ঋণ, ভর্তুকি মূল্যে সার, কীটনাশক ও বিদ্যুৎ সুবিধা। তেমনি চা খাতের জন্যও রেয়াতি সুদে কৃষি ঋণ চালুর মতো বিশেষ উদ্যোগ দরকার।

চা শিল্পের সঙ্গে শ্রমিকদের সম্পর্ক বংশপরম্পরায়। শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে এ শিল্পের উন্নয়ন হলেও উন্নত হচ্ছে না তাদের জীবনযাত্রার মান। বাংলাদেশের চা শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে শ্রমিকের জীবনমানেরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর কাজটি সরকার ও মালিকদেরই করতে হবে। চা শ্রমিকরা যে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার, তার বড় আলামত মেলে তাদের কম মজুরি থেকে। বর্তমানে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক নগদ মজুরি ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা। দৈনিক নগদ মজুরির সঙ্গে একজন শ্রমিক আরো যা পান তা হলো প্রতি সপ্তাহে ৩ দশমিক ৩ কেজি ভর্তুকি মূল্যে আটা বা চাল পান বাগান মালিকের কাছ থেকে। ভর্তুকি মূল্যে প্রতি কেজি চাল বা আটার জন্য তাকে ২ টাকা ব্যয় করতে হয়। এছাড়া বাগানের বাসস্থান, কৃষিজ জমি, স্কুল, প্রাথমিক চিকিৎসা, বোনাসসহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকেন শ্রমিকরা। কিন্তু দেশীয় বাস্তবতায় চা শ্রমিকদের জন্য এসব সুবিধা খুবই নগণ্য। মজুরি বৈষম্যসহ বিভিন্ন ধরনের বঞ্চনার কারণে চা জনগোষ্ঠীর মানুষ অন্যান্য নাগরিকের চেয়ে অনেক পেছনে পড়ে আছে। শিক্ষা, ক্রীড়া, প্রযুক্তি বা বিনোদন কিছুই নাগালে নেই চা শ্রমিকদের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সুপেয় পানিসহ মৌলিক সব সূচকে পিছিয়ে রয়েছেন তারা। জরাজীর্ণ বাসস্থান আর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকায় বিভিন্ন রোগে ভুগছেন অনেকে। তার পরও চা শ্রমিকরা পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে রাখছেন অনবদ্য অবদান।

চা শিল্প শুধু অর্থনীতির নয়, সামাজিক খাতও বটে। দেশের প্রায় পুরো অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণকারী এ খাত ধ্বংসের মুখে পড়লে শুধু লক্ষাধিক শ্রমিক নয়, পুরো দেশের চা সরবরাহ ও রফতানি ব্যাহত হবে। এমনকি বিদেশ থেকে চা আমদানির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তাই দেশের শতবর্ষের পুরনো এ শিল্প খাতকে রক্ষা করতে হলে নীতিগত সংস্কার, আর্থিক সহায়তা ও বাজারভিত্তিক স্থিতিশীলতা আনতে সরকার, ব্যাংক খাত ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে একযোগে কাজ করা দরকার। যত দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যাবে, তত দ্রুত এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।