বর্তমানে শুধু বড় শহর নয়; মাঝারি ও ছোট শহর—এমনকি গ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশ বর্জ্য অব্যবস্থাপনার সমস্যায় জর্জরিত। দূরের পাহাড়, বন, প্রাকৃতিক জলাশয়ও প্লাস্টিক, চিপসের প্যাকেট আর পেট বোতলের অত্যাচার থেকে মুক্ত নয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ব্যর্থ হয়েছে তেমনি আমরা নিজেরাও নগরে বাস করেও ভালো নাগরিক হয়ে উঠতে পারিনি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিক থেকে দেশের ১২ সিটি করপোরেশন, ৩২৯ পৌরসভা ও ৪৯৫ উপজেলার প্রতিটি নগর এলাকার চিত্র কেমন? ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট কোনো বড় শহরেই সফল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদাহরণ নেই।
বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোয় আংশিক বর্জ্য ব্যবস্থা চালু থাকলেও উপজেলাগুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থা শুরুই হয়নি। অথচ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে পর্যন্ত প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ইলেকট্রনিক বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্য এসব ক্ষতিকারক বর্জ্যইবা কোথায় যায়? যেখানে কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সামান্যতম প্রস্তুতি নেই? অথচ ‘কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ নামে একটা আইনও দেশে আছে, যদিও সেটা আমলাতান্ত্রিকতানির্ভর একটা আইন, যার কোনো প্রয়োগ নেই।
দেশে বড় শহরে বেশি মানুষ বাস করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশি; স্বাভাবিকভাবে সবার দৃষ্টি এখানেই বেশি। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের অলক্ষ্যেই মাঝারি শহরগুলোর বর্জ্য অব্যবস্থাপনায় দেশের খাল-বিল, নদী-নালা, জলাভূমি, কৃষিভূমি, নগরজীবন ও সামগ্রিক পরিবেশ দূষণের কবলে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে নগরে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং নগর জীবনের গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে। দেশের ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি নগর এলাকায় বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা দেখা যায়। তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অদক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে দৈনিক গড়ে মাথাপিছু শূন্য দশমিক ৫৬ কেজি হারে মোট ২৫ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। উপজেলা এলাকায় বর্জ্য উৎপাদনের মূল স্থান হলো দেশের প্রায় বিভিন্ন সাইজের সাড়ে নয় হাজার বাজার। জনপ্রতি শূন্য দশমিক ৩২ কেজি হারে দেশে এ বাজারগুলো থেকে উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ দৈনিক ৪ হাজার ৩০০ টন। এসব জৈব-অজৈব মিশ্র কঠিন বর্জ্যের গন্তব্য কোথায়? আশপাশের নিচু এলাকা, সরকারি জমি, খাল অথবা নদী। ফলাফল—দেশের নদী-নালা ও জলাশয়ের পানিদূষণ, জমিদূষণ, বায়ূদূষণ ইত্যাদি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাটি সম্পূর্ণ একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া যার প্রতিটি স্তরই তার প্রয়োগ করতে হয়। কোনো একটি স্তরে ঘাটতি থেকে গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুফল পাওয়া যাবে না। দেশের নগরাঞ্চলে বর্জ্য উৎসে পৃথক্করণ, বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, রিসাইকেল, পুনর্ব্যবহার এবং স্যানিটারি লান্ডফিল না থাকায় উৎপাদিত বিশাল পরিমাণ জৈব ও অজৈব মিশ্র বর্জ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে উন্মুক্ত জমি কিংবা জলাশয়ে ফেলে দেয়া হচ্ছে। এসব বর্জ্যের তিন-চতুর্থাংশই হলো জৈব প্রকৃতির যা থেকে প্রতিনিয়ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে ২৮ গুণ বেশি ক্ষতিকারক মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণ হচ্ছে।
বাংলাদেশের মাঝারি শহরগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা নানা দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়।
অধিকাংশ মাঝারি শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই, যা করা হয় তা প্রধানত প্রতিক্রিয়াশীল পরিকল্পনা। শহরগুলোয় আধুনিক ডাম্পিং সাইট, ট্রান্সফার স্টেশন বা রিসাইক্লিং প্লান্ট নেই। ফলে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ হয় না। রাস্তার ধারে যেখানে খালি এবং নিচু এলাকা পাওয়া যায়, সেখানেই বর্জ্য ফেলা হয়। ফলে বৃষ্টির পানির মাধ্যমে অনেক বিস্তৃত এলাকায় এর প্রভাব পড়ে।
সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার স্যানিটেশন/পরিচ্ছন্ন কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। অনেক সময় লোকবলও কম। বাজেট স্বল্পতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের অনীহার কারণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যায় না। নাগরিকরা বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলে না, উৎসে বর্জ্য পৃথক্করণ হয় না, ফলে পুরো ব্যবস্থাপনাই ভেঙে পড়ে।
বাংলাদেশে নগর এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বর্জ্য ফেলার জন্য নির্ধারিত জায়গার অভাব, বিশেষ করে আবাসিক এলাকার পাশে বা শহরের প্রান্তে উপযুক্ত ল্যান্ডফিল নেই। জমির অপ্রতুলতা, উচ্চমূল্য, স্থানীয় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ইত্যাদির কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ল্যান্ডফিল নেই। এছাড়া প্রচলিত আইন বা পৌর বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না।
আধুনিক প্রযুক্তি যেমন জিপিএস-ভিত্তিক সংগ্রহ, বায়োগ্যাস বা কম্পোস্টিং প্লান্টের ব্যবহার নেই বললেই চলে। অথচ পুরো প্রক্রিয়টি ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানভিত্তিক মডেল আছে। প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল ছাড়া এ বিশাল কাজটি ভালোভাবে করা সম্ভব নয়।
সমস্যা:
নিয়মভঙ্গের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয় না। ফলে মানুষ বর্জ্য ফেলা নালা-নর্দমা, খাল-বিল ভরাট করে ফেলে। দেশের প্রতিটি নগরে জলাবদ্ধতার সমস্যা আছে, তার পেছনে বড় কারণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। শুধু জলাবদ্ধতা নয়, দেশের নদী-খাল দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে এ অব্যবস্থাপনার কারণে। অনেক পৌরসভা বা উপজেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ কর্তৃত্ব বা দক্ষতা না থাকায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না। শহরগুলো দ্রুত মানুষ বাড়লেও সে অনুপাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ছে না।
বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কম বয়সী শিশু-কিশোরদের যুক্ত হওয়া একটি গুরুতর সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা। বর্জ্যের মধ্যে থাকা পচা খাবার, মেডিকেল বর্জ্য ও জীবাণুজনিত বস্তু থেকে হেপাটাইটিস, টাইফয়েড, ডায়রিয়া, চর্ম রোগ এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগ ছড়ায়। ধারালো বস্তু, কাঁচ, সূঁচ বা অন্যান্য বিপজ্জনক বস্তু থেকে শারীরিক আঘাত হতে পারে। এছাড়া ইলেক্ট্রনিক বর্জ্য বা শিল্পবর্জ্যে থাকা সিসা, লেড, ক্যাডমিয়াম প্রভৃতি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। অনেক ক্ষেত্রেই এরা ন্যায্য মজুরি পায় না এবং তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শোষণ করা হয়।
সার্কুলার ইকোনমির সম্ভাবনা:
দেশে হাজার হাজার মানুষ বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথক্করণ ও পুনর্ব্যবহারের কাজে যুক্ত থাকলেও এ অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ড থেকে অনেক পিছিয়ে। অনেক প্লাস্টিক দ্রব্য, নির্মাণসামগ্রী অনানুষ্ঠানিকভাবে রিসাইকেল করা হয়। যদিও অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুও এ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকে, সেটা মনে রাখতে হবে। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সার্কুলার ইকোনমির একটা সম্ভাবনা আছে।
পরিকল্পিত সার্কুলার ইকোনমির কাঠামো তৈরি করা হলে সরকারি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারে। শহরাঞ্চলে সেগ্রিগেটেড বর্জ্য সংগ্রহ, কম্পোস্টিং, মেটাল ও প্লাস্টিক রিসাইক্লিং সেন্টার গড়ে তোলা সহজ হয়। পরিকল্পিত সার্কুলার ইকোনমি শহরের বর্জ্যের পরিমাণ কমাবে এবং ল্যান্ড ফিলের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করবে।
সঙ্গে সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান, পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই নগর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সীমিত সম্পদ আছে, সেখানে এ মডেলটি ভবিষ্যতের টেকসই সমাধান হয়ে উঠতে পারে। সরকারি সহযোগিতায় বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সার্কুলার ইকোনমিকে আনুষ্ঠানিক খাতে পরিণত করা গেলে দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আইনি দিক:
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর-২০ ধারা বলে ‘কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১’ প্রণীত হলেও এ আইনের প্রয়োগ পৌরসভা এলাকায় সামান্য মাত্রায় থাকলেও উপজেলা এলাকায় নেই বললেই চলে।
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ধারা ২৪-এ বলা হয়েছে পৌরসভাগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকরভাবে কাজ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পৌরসভার আর্থিক সক্ষমতা, দক্ষ জনবল, সঠিক নেতৃত্বের কারণেও দেশের পৌর এলাকাগুলোয় ভালো বর্জ্য ব্যবস্থা কখনই গড়ে উঠেনি।
উপজেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ অনুযায়ী বেশকিছু সরকারি সংস্থা উপজেলা পর্যায়ে কাজ করলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান কোনো কাজ নেই।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের বড় কিংবা মাঝারি শহরগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট শুধু অবকাঠামোগত নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যেখানে পরিকল্পনা, অর্থ, জনসম্পদ, আইন প্রয়োগ ও নাগরিক আচরণ—সবকিছুই জড়িত। সমন্বিত পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, জনসচেতনতা ও স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি শহরগুলোর টেকসই উন্নয়নের জন্য কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যাবশ্যক। বর্তমান ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। তবেই এসব শহরকে সুস্থ, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব রূপে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
আকতার মাহমুদ: নগর পরিকল্পনাবিদ এবং অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










