গত এক দশকে আমরা এ খাতে একের পর এক বড় নীতিগত পরিবর্তন দেখেছি— সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির প্রবর্তন, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা চালু ও পরে বাতিল এবং সর্বশেষ নতুন জাতীয় পাঠ্যক্রম চালু করা ও পরে বাতিল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কতটা নিখুঁত পদ্ধতিতে করা গবেষণা ও প্রমাণ ছিল? উদাহরণ হিসেবে নতুন পাঠ্যক্রমের কথা ধরা যাক। আগের পাঠ্যক্রমটি কেন ব্যর্থ ছিল তা নিয়ে সুসংগঠিত কোনো গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ জনসমক্ষে খুব কমই এসেছে। তবু নতুন পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সে নতুন পাঠ্যক্রম বাতিল করা হয়েছে যথেষ্ট গবেষণালব্ধ জ্ঞান ছাড়াই যে এটি কেন ব্যর্থ ছিল। অর্থাৎ নীতি পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু গবেষণানির্ভর আলোচনা খুব কম।
সম্প্রতি স্কুলে ভর্তি নীতির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যিনি অনেক তরুণের কাছে এক ধরনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, সেই তরুণ সংসদ সদস্যদের একজন সম্প্রতি সংসদে স্কুলে ভর্তি পদ্ধতিতে লটারির ব্যবস্থা বাতিল করার প্রস্তাব তুলেছেন। তিনি তরুণ; তাই হয়তো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি যে এমন একটি প্রস্তাব আমাদের মতো দেশে শিক্ষাগত বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দিতে পারে, যেখানে শিক্ষা বৈষম্য এরই মধ্যেই বেশ উচ্চ।
তবে আরো বিস্ময়কর বিষয় শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে হঠাৎ ঘোষণা ২০২৭ সাল থেকে স্কুলে ভর্তি লটারির ব্যবস্থা বাতিল করা হবে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: বাংলাদেশে বা অন্য কোনো দেশে লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতির বিরুদ্ধে কী ধরনের নিখুঁত গবেষণা রয়েছে?
বরং অনেক উন্নত দেশে যেমন যুক্তরাজ্যে স্কুলে ভর্তি সাধারণত পরীক্ষাভিত্তিক নয়। সেখানে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা বা স্কুল ক্যাচমেন্ট এরিয়া অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। পরীক্ষাভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি প্রায়ই বৈষম্য বাড়াতে পারে। ফলে তথাকথিত “ভালো” স্কুলে পড়ার সুযোগ শৈশবের খুব শুরুতেই মূলত সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের শিশুদের জন্য সীমিত হয়ে যেতে পারে। এমনকি পরবর্তী পর্যায়ে যে মেধাকে আমরা গুরুত্ব দিই, সেটিও অনেক সময় সামাজিক সুবিধা ও সুযোগের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইঙ্গিত দেয়। গত বছর শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতির জার্নাল American Economic Journal: Applied Economics-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় নরওয়ের প্রেক্ষাপটে মেধাভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতির ফলাফলকে ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের বেশি প্রতিযোগিতামূলক বিদ্যালয়ে মেধার ভিত্তিতে বণ্টন করার ফলে সামগ্রিকভাবে খুব ছোট কিন্তু নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। কারণ এ ব্যবস্থায় যে উচ্চ ক্ষমতার শিক্ষার্থীরা ভালো বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়, তাদের শেখার ফলাফলে তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে না। কিন্তু একই সঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম সক্ষম যেসব শিক্ষার্থী ওই বিদ্যালয়গুলো থেকে বাদ পড়ে, তারা সম্ভাব্য কিছু ইতিবাচক সুযোগ হারায়। ফলে সামগ্রিক ফলাফল প্রত্যাশিত ইতিবাচক
হয় না।
অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী জশুয়া অ্যাংগ্রিস্ট ও তার সহগবেষকদের একটি গবেষণা ২০১৪ সালে শীর্ষস্থানীয় জার্নাল ইকোমেট্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ও নিউইয়র্ক শহরের পরীক্ষাভিত্তিক বিশেষায়িত স্কুলে ভর্তি ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, এসব স্কুলে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা সাধারণত তুলনামূলকভাবে বেশি মেধাবী সহপাঠীদের সঙ্গে পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এমন সহপাঠীদের সঙ্গে পড়ার সুযোগ পেলেও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল বা পরে কোন মানের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা যায় এসব ক্ষেত্রে তেমন বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না।
এ গবেষণাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। শুধু পরীক্ষার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের আলাদা করা সবসময় শিক্ষার মান বাড়ায় না; বরং অনেক সময় তা বৈষম্য বাড়াতে পারে।
নেতিবাচক প্রভাবের আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে শিক্ষকদের আচরণগত প্রতিক্রিয়া। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি ও এসথার ডুফলো তাদের Poor Economics বইয়ে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে দেখা যায়, যদি শিক্ষকরা আগে থেকেই জানেন যে তারা তুলনামূলকভাবে কম সক্ষমতা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে তারা পড়ানোয় কম পরিশ্রম করতে পারেন। কিন্তু যখন শিক্ষকরা আগে থেকে জানেন না যে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি না কম সক্ষমতা সম্পন্ন, তখন তারা সাধারণত সমান মনোযোগ ও প্রচেষ্টা দিয়ে পড়ান। ফলে শিক্ষার্থীদের ‘সক্ষমতা’ অনুযায়ী আগেভাগে আলাদা করে দিলে কখনো কখনো শিক্ষকদের প্রত্যাশা ও প্রচেষ্টাও কমে যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, শিক্ষা খাতে বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নীতিনির্ধারকদের গবেষকদের সঙ্গে আরো বেশি আলোচনা ও পরামর্শ করা জরুরি। প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা শুধু ভালো নীতিনির্ধারণের জন্যই নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখা জরুরি সিদ্ধান্ত যেন নির্ভরযোগ্য গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে গ্রহণ করা হয়।
নীতিনির্ধারক ও গবেষকেরা যদি একসঙ্গে কাজ করে গবেষণালব্ধ তথ্য খুঁজে বের করেন এবং প্রয়োজনে নতুন নির্ভরযোগ্য গবেষণা করে সমাধান তৈরি করেন, তবেই শিক্ষানীতিতে টেকসই ও কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ড. মুহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন: গবেষণা ফেলো, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)
(এ লেখায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণভাবে লেখকের ব্যক্তিগত; এর সঙ্গে তিনি যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কোনো সম্পর্ক নেই)










