আমি মওলানা ভাসানীর একজন ভক্ত। ভাসানী এমন এক চরিত্র; তাকে নানা মানুষ বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। বাংলাদেশের অনেকের মধ্যে যে বৈচিত্র্যময়তা আমরা দেখি, তিনি ছিলেন তেমন।

মওলানা ভাসানী কেমন ছিলেন এর একটি ধারণা পাওয়া যায় ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন উপলক্ষ্যে টাঙ্গাইল শহর থেকে সন্তোষের কাগমারী পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার রাস্তায় নির্মিত তোরণগুলোর নাম থেকে। তিনি সমকালীন নেতাদের মতো তোরণগুলোর নাম কোনো দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে করেননি। তিনি তোরণগুলোর নামকরণ করেছেন দেশ-বিদেশের তৎকালীন খ্যাতিমান লেখক বা চিন্তাবিদদের নামে যাদের লেখা মানুষ পড়তেন। একজন নেতা হিসেবে তার এমন মননশীলতা আমাদের চিন্তার বাইরে।

তিনি যেমন সুফী ছিলেন, তেমনি ছিলেন বাংলাদেশের পরিবেশবাদী আন্দোলনের অগ্রনায়ক। তিনি হাজার হাজার লোক নিয়ে লংমার্চ করেছেন ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে একটা নদী আটকে দিলে দেশে এর কী প্রভাব পড়বে। কারণ এটি আমাদের টিকে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার এ লং মার্চ তিনি না করলেও পারতেন। কেননা তখন তার বয়স প্রায় নব্বইয়ের বেশি। কিন্তু বাস্তব এই যে জীবনজুড়েই তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন। প্রতিটা সংকট নিয়েই তিনি কথা বলেছেন। এদেশে তার মতো রাজনৈতিকভাবে সঠিক লোক আরেকটা পাওয়া কঠিন। যদিও অনেকে তার ভোটের রাজনীতি না করার প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু আমার মনে হয় তিনি যদি ১৯৭০ সালের নির্বাচন করতেন, আওয়ামী লীগ হয়তো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না-ও পেতে পারত।

মওলানা ভাসানী যেমন দক্ষ রাজনৈতিক ছিলেন, তেমনি রাজনীতির সরল কথকও ছিলেন। আমাদের দেশে অধিকাংশ ব্যক্তি মার্ক্সবাদ নিয়ে কথা বলার সময় এমন শব্দ ব্যবহার করেন যে লোকে তাদের কথায় মনোযোগ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু মওলানা ভাসানীর বক্তৃতার মধ্যে কঠিন গালভারি কোনো তাত্ত্বিক শব্দের ব্যবহার থাকত না। তিনি জীবনভর আন্দোলন আর রাজনৈতিক দর্শনকে সরল করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এসব ক্ষেত্রে কখনো তিনি অনেক লোকের সঙ্গ পেয়েছেন, অনেক অনুসারী পেয়েছেন। আবার কখনো কাউকেই সঙ্গে পাননি।

তাকে নিয়ে রচিত সৈয়দ ইরফানুল বারীর লেখা একটা বই আছে, ‘আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী’। বইটি থেকে জানা যায়, মওলানা ভাসানীর কান পচা একটা কুকুর ছিল। কুকুরের প্রতি তার যে মমত্ব ছিল তা কল্পনাতীত। আবার তিনি যমুনার ওপারে যাওয়ার সময় চরের মধ্যে কখনো নৌকা আটকে গেলে নেমে ওই নৌকা নিজেই ঠেলেছেন। তিনি এমন মায়ময় ও সরল জীবনের অধিকারীও ছিলেন।

তাই তাকে কেউ সুফি হিসেবে দেখতে পারেন, তাকে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে দেখতে পারবেন, বাঙালি মুসলিম জনপদের একজন সংগ্রামী নেতা হিসেবে দেখতে পারবেন। আবার তাকে জনমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবেও দেখতে পারবেন। কিন্তু তিনি কখনো সাম্প্রদায়িকতা করেছেন, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

যেখানে যেখানে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন, সেখানেই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা ৭ মার্চের ভাষণের কথা শুনি, কিন্তু আমরা ৯ মার্চের কথা ভুলে যাই। যেখানে তিনি দীর্ঘ একটা ভাষণ দিয়েছেন। সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।

পাকিস্তানের ইতিহাস মূলত আমরা বঞ্চনার জায়গা থেকে পড়ি। অনেকেই মনে করেন এ ইতিহাস স্নায়ুযুদ্ধ দিয়ে প্রভাবিত। অনেকে মওলানা ভাসানীকে স্নায়ুযুদ্ধের অংশীজন মনে করেন। এমনকি তাকে সিআইএর এজেন্টও মনে করেন অনেকে। বামপন্থীদের মতে, মওলানা ভাসানী পাকিস্তানের কিছু কিছু জায়গায় আপস করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার জীবনী পড়লে বোঝা যায়, তিনি কতটা সহজ-সরল ও যেকোনো আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

মওলানা ভাসানী নিজের ধর্ম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতায় তার ধর্মবিশ্বাসের কথা উঠে আসেনি। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার শব্দচয়ন ছিল একদম যথোচিত। ফলে সেই সময় জাতীয়তাবাদী (ন্যাশনালিস্ট) থেকে শুরু করে চরমপন্থী (এক্সট্রিমিস্ট) সবাই তাকে সন্দেহ করেছেন। তিনি সেই সময় একই সঙ্গে সবার বন্ধু ও শত্রু—দুই-ই ছিলেন।

মওলানা ভাসানী কখনো রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা চিন্তা করেননি। নিজের সন্তানদের তিনি কখনো সামনে আনেননি। সত্তরের দশক কেটেছে দাঙ্গার মধ্যে। সেই সময়ও তিনি ছিলেন অহিংস প্রকৃতির মানুষ।

তিনি অসম্ভব আশাবাদী একজন মানুষ ছিলেন। মারা যাওয়ার সময়ও তিনি আশাবাদী ছিলেন। তার আশার কোনো শেষ ছিল না। তিনি যেমন সর্বদা কাজের মধ্যে থাকতেন, তেমনি আশায় থাকতেন। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে নানা টানাপড়েন আসে। আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। অফিসে বসের একটা ঝাড়ি খাওয়ার পর মনে হয় চাকরি ছেড়ে চলে যাই। আশাহত হই আমরা। আমার সঙ্গে

এমন অনেকবার হয়েছে। কিন্তু তাকে কোনোদিন আশাহত হতে দেখিনি। তিনি ভেবেছেন যে এটা তার কাজ, এটা করতে হবে এবং তিনি সে কাজ করেছেন। একটা কর্মীর জীবন। সেই আসাম থেকে শুরু করে তিনি একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

আবার তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক জীবন সর্বদা স্বতন্ত্র ছিল। তার মাথায় টুপি ছিল কিন্তু সেই টুপির গল্প কেউ কোনোদিন শোনেনি। এমনকি যারা তার সংস্পর্শে ছিলেন, তারাও কোনোদিন শোনেননি। তিনি ধর্মান্ধ ছিলেন না যেমন, তেমনি আবার ধর্মীয়গত দিক থেকে কোনো ধরনের সংকীর্ণতায় ভুগতেন না। তিনি যেখানে গিয়েছেন, কথা বলেছেন। বিদেশে গিয়েছেন, চিন্তামুক্ত থেকেছেন। কারণ তার কোনো কিছু লোক দেখানো, বানোয়াট ছিল না। তিনি সর্বদা স্বাচ্ছন্দ্যে থেকেছেন। তারা সততা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। একটা ভাস্বর জীবন কাটিয়েছেন। আমি এসব ভাবি আর চিন্তা করি যে আমরা কেন এমনটা পারি না।

আর যতগুলো লক্ষ্য নিয়েছিলেন, সবগুলোয় সফল হয়েছেন। ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের কথা এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। টাঙ্গাইলের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো সেভাবে উন্নত নয়। কিন্তু সেই সময়

সেই ভাঙাচোরা রাস্তার টাঙ্গাইলের সন্তোষে অতগুলো মানুষকে তিনি জড়ো করেছিলেন। আগেও বলেছি, তার নির্মিত তোরণগুলো পর্যালোচনা করলেই তার চরিত্রের প্রজ্ঞা জানা যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পেয়েছি, তারা প্রায় সবাই ত্রুটিপূর্ণ চরিত্রের ছিলেন।

শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত চমৎকার চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত শেখ মুজিব একজন ব্যর্থ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সেই সময় নিয়ে আমাদের আরো পড়া ও লেখালেখি হওয়া উচিত। খুব শান্তশিষ্ট, কর্মঠ জীবন ছিল তাজউদ্দীন আহমদের। কিন্তু অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। কর্নেল তাহেরকে নিয়ে পড়া যায়। তবে তার আদর্শে খুব দ্রুতই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে বলে আমার ধারণা। সেই সময় আরো যারা সর্বহারা দলের ছিলেন, যাদের লেখার ছিটেফোঁটা হলেও পাওয়া যায়, তাদের চিন্তাভাবনা ছিল অনেক সংকীর্ণ। তারা শ্রেণীশত্রু খতমের কথা বলতে বলতেই সত্তর-আশি-নব্বইয়ের দশক পার করে ফেলেছেন। সেই সময় চিন্তাই করা হয়েছে যে অমুককে মারলে বোধ হয় একটা সহজ পথ পাওয়া যাবে। সেই সময় মিলিটারি শাসক যারা ছিলেন, তাদের

ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

কিন্তু কোনো অনন্য নেতা আমি দেখি না যিনি স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছেন মহীরুহের মতো। আওয়ামী লীগের মধ্যেও দেখি না, বিএনপির মধ্যেও না। তবে গত ১৫ বছরের বিচারে মনে হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বেশ চমৎকার একজন মানুষ। তবে তার মওলানা ভাসানীর মতো অ্যাক্টিভিজমের ইতিহাস নেই। মওলানা ভাসনীর প্রতিটা লক্ষ্য সঠিক ছিল। এটি কেউ কল্পনাও করতে পারে না যে কীভাবে সম্ভব! এর কারণ হিসেবে অনেকে বলে যে তিনি কখনো সরকারে ছিলেন না তাই। কিন্তু তিনি যেসব বিষয়ের পক্ষে ছিলেন, কোনো ভুল বিষয়কে কখনই বেছে নেননি।

বাংলাদেশের যতগুলো রাজনৈতিক দল আছে সেসব দলের কোন নেতাকে পরিচ্ছন্ন পাবেন? তাদের বিপরীতে মওলানা ভাসানী একজন উজ্জ্বল ও নির্মলতম মানুষ।

শফিকুল আলম: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব

[মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ১৪৫তম জন্মদিন উপলক্ষে বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপচারিতায়]