এ বছর ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’—এ প্রতিপাদ্যে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য দিনটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার উপলক্ষ নয়, এটি এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর দিন। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগীদের তালিকায় এ দেশটির নাম বারবার শীর্ষে আসে। ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেক্সে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম সর্বোচ্চ জলবায়ু-ঝুঁকিপ্রবণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে মানুষের জীবনযাপন ও জীবিকার ক্ষত এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করেই পরিবেশের বিপন্ন দশা এবং তা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু ন্যায়বিচারকে আন্তর্জাতিক স্লোগান নয়, বরং বাংলাদেশের টিকে থাকার শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে জলবায়ু সংবেদনশীল নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

পরিবেশ বিপর্যয় মানুষকে নানাভাবে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলছে। মানবসৃষ্ট কারণে পানি, মাটি, বায়ু এমনকি জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, জনস্বাস্থ্য, বাসযোগ্যতা, পরিবেশের ভারসাম্য, কৃষি উৎপাদন এমনকি অসময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগও বেড়ে চলেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় দেশের মানচিত্র ছোট হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা একটি বড় সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্র স্তর ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা প্রায় নয় লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে; ২১০০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২১ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ সংকটের প্রধান শিকার বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বনটি লবণাক্ততার চাপে ধীরে ধীরে বিপর্যস্ত হচ্ছে। নোনা পানির অনুপ্রবেশে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুপেয় পানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে এবং স্থানীয় জেলে ও বনজীবী সম্প্রদায়ের জীবিকা ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে। সুন্দরবন আমাদের শেষ প্রাকৃতিক ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে উপকূলের প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে। ভূমিদস্যুদের উৎপাতে বনের গাছ কেটে ইটভাটায় পোড়ানো এবং বন্যপ্রাণী শিকারের ফলে আমাদের প্রাকৃতিক ঢালগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে সিডর, আইলার মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলো এখন সরাসরি লোকালয়ে আঘাত হানছে এবং প্রতি বছর দেশের অর্থনীতি ও জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে।

এদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নগরাঞ্চলে সবুজায়নের অভাব থাকায় তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাহিদা পূরণের জন্য সংকুচিত হচ্ছে জলাশয় ও ফাঁকা স্থান। এ দেশের জীবনরেখা নদীগুলো আজ ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা থেকে শুরু করে তুরাগ নদের পানি কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য আর অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্যের কারণে কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধময় হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের ড্রেন ও নর্দমাগুলো প্লাস্টিক বর্জ্যে আটকে গিয়ে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। এ বর্জ্যগুলো মাটির নিচে জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দিন দিন আরো নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। নদীতে কোনো অক্সিজেন না থাকায় জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আর নদীর তীরবর্তী মানুষজন চর্মরোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছে। শহরাঞ্চলে তাপপ্রবাহ বেড়ে চলেছে। তাপপ্রবাহের ক্ষয়ক্ষতি পড়ছে জনজীবনেও। দ্য ল্যানসেট কাউন্টডাউন অন হেলথ অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, শুধু ২০২৪ সালে অতিরিক্ত তাপের কারণে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়ে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির ৫ শতাংশের সমান। সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়—এটি কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিকের হাজারো হারানো কর্মদিনের হিসাব। ঢাকা মহানগরীতে তীব্র উত্তাপ এখন নিয়মিত অভিজ্ঞতা। গবেষণা বলছে, দেশের সবুজ আচ্ছাদন তিন দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কংক্রিটের বিস্তার বেড়েছে, জলাশয় ভরাট হয়েছে। ফলে নগর তাপদ্বীপ প্রভাব (আরবান হিট আইল্যান্ড) প্রতি বছর তীব্র হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব জনস্বাস্থ্যের জন্যও বাড়তি সংকট। গবেষণা বলছে, ১৯৫১-১৯৬০-এর তুলনায় ২০১৫-২০২৪ দশকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য জলবায়ু-উপযুক্ততা ৯০ শতাংশ বেড়েছে। উষ্ণতর আবহাওয়া ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এডিস মশার প্রজনন চক্রকে দীর্ঘ করছে এবং ডেঙ্গু এখন শুধু ঢাকার নয়, সারা দেশের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে আরেক নীরব মহামারী বায়ুদূষণ। ঢাকার বার্ষিক গড় পিএম ২ দশমিক ৫ মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার প্রায় ২০ গুণ বেশি। ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প-কারখানা ও ফসলের অবশিষ্ট পোড়ানো মিলিয়ে বায়ুদূষণ এখন বাংলাদেশে অকালমৃত্যুর শীর্ষ তিনটি কারণের একটি। এটি শিশুদের ফুসফুসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে, কার্ডিওভাসকুলার রোগ বাড়াচ্ছে এবং শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমাচ্ছে।

ঝুঁকি রয়েছে কৃষি উৎপাদনেও। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, আবহাওয়াজনিত কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৮০ কোটি ডলার সমপরিমাণ ফসলের ক্ষতির শিকার হয়। চলতি বছর এপ্রিল-মে মাসে অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলে ৪৬ হাজার হেক্টরেরও বেশি বোরো ধান তলিয়ে যায়। এ সময় জাতীয় উৎপাদনে প্রায় দুই লাখ টনের ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। মৌসুমি বৃষ্টির অনিয়মিততা ও দীর্ঘস্থায়ী খরা একদিকে চাষের সময়সূচি এলোমেলো করছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত সেচের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে। উত্তরাঞ্চলে খরা ও দক্ষিণে লবণাক্ততা একসঙ্গে কৃষকদের কোণঠাসা করছে। এ প্রেক্ষাপটে, কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারের নিঃসরণ ও মিথেন নির্গমনও বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে চক্রাকারে উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় তাপমাত্রার ওঠানামা—এল নিনো ও এল নিনা—বাংলাদেশের আবহাওয়া চক্রকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এল নিনোর বছরগুলোতে বর্ষা দুর্বল হয়, খরার প্রবণতা বাড়ে; এল নিনার বছরে বৃষ্টিপাত ও বন্যা অতিরিক্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ দোলাচল আরো তীব্র হচ্ছে, পূর্বাভাস দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং কৃষক থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকারী—সবার পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশ-বিপর্যয় মানুষকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রতি বছর প্রায় চার লাখ মানুষ ঢাকায় আসছে—এদের ৬৬ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয়কে অভিবাসনের মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। ঢাকায় এখন প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৭ হাজার ৫০০ জন বাস করেন। এ বিপুল ঘনত্বের নগরে পরিকল্পনাহীন বৃদ্ধি, জলাভূমি ধ্বংস, সবুজের অভাব এবং তাপপ্রবাহ মিলে শহরকে ক্রমেই বসবাস-অনুপযোগী করে তুলছে। একই অবস্থা অন্য নগরগুলোর ক্ষেত্রেও।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগের পর পুনর্বাসনে যে অর্থায়ন করা হয় তার তুলনায় অনেক কম খরচেই জলবায়ু সংবেদনশীল নগর পরিকল্পনা সম্ভব। তবে সেই দূরদর্শিতা এখন পর্যন্ত নীতি ও বাস্তবায়নে পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয়নি। তবে এখনো সময় আছে। নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু ভাবনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নতুন ভবন ও অবকাঠামোর অনুমোদনে সবুজ আচ্ছাদন ও তাপসহিষ্ণুতার মানদণ্ড আবশ্যক। জলাশয় পুনরুদ্ধার ও নগর বনায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষিতে জলবায়ু অভিযোজন ত্বরান্বিত করতে হবে। তাপসহিষ্ণু ও লবণাক্ততা-প্রতিরোধী জাতের বিস্তার, ক্রপ ইন্স্যুরেন্স প্রবর্তন এবং মৌসুমনির্ভর সেচ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক ও উন্নত প্রযুক্তিগত সমাধান ব্যবহার বাড়াতে হবে। এভাবে মাটির অ্যাসিড তীব্রতা ও পানিদূষণ ঠেকানো সম্ভব হবে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জলবায়ু-সংবেদনশীল প্রোটোকল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাপপ্রবাহের সময় অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য কুলিং সেন্টার, আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে বছরব্যাপী পর্যবেক্ষণ কাঠামো জোরদার করতে হবে।

পরিবেশ দূষণ রোধে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং শিল্প ও উৎপাদন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা জরুরি। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদন ব্যবস্থার রূপান্তর দ্রুত করতে হবে। সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির বিস্তারে সরকারি প্রণোদনা বাড়ানো এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পরিকল্পিতভাবে বেরিয়ে আসার রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। ঘূর্ণিঝড়-বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ-প্রস্তুতি আরো শক্তিশালী করতে হবে। এল নিনো-এল নিনার পূর্বাভাস কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে হবে। গোটা বিশ্বেই জলবায়ু সংবেদনশীলতা উন্নতি এমনকি বাণিজ্যিক সম্পর্কেরও পূর্বশর্ত। তাই উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন আদায়ে বাংলাদেশকে আরো দৃঢ়ভাবে কূটনৈতিক কণ্ঠস্বর তুলতে হবে। কপ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবি জোরালো হওয়া দরকার।

বর্তমানে প্রাকৃতিক যে বিপর্যয় আসছে তা কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা নয়, মানুষেরই তৈরি সংকট। দেশের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ—সবাইকে এ সত্যটি আজ স্বীকার করতে হবে যে জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় বিলম্বের মূল্য আমাদেরই সবচেয়ে বেশি দিতে হবে। পরিবেশ দিবসের এই দিনে সেটাই হোক আমাদের সংকল্প।