বিশ্বজুড়ে মুসলিমপ্রধান ও উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে এমন দেশগুলোতে প্রতি বছর ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহায় বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানি করা হয়। এ সময় পশুপালন ও সংশ্লিষ্ট খাত দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় প্রভাব রাখে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে এক গবেষণার বরাতে জানা গেছে, কোরবানিকেন্দ্রিক সবচেয়ে বড় অর্থনীতি বাংলাদেশ। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য কোরবানি ধর্মীয়ভাবে অবশ্যকর্তব্য। সে গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতি বছরের মতো এবারো সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ জোর প্রস্তুতি রেখেছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর ১ কোটি ২৪ লাখ পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। চাহিদার চেয়ে এ বছর ২১ লাখ পশু বেশি রয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় ২৭টি অস্থায়ী পশুর হাটসহ সমগ্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ বছর ৩ হাজার ৬০০টির বেশি কোরবানির পশু বিক্রির হাট বসার কথা রয়েছে। এবার পশুর হাট বসানোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বেশকিছু নিয়ম ও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ঢাকায় ২৭টিসহ গোটা দেশে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি পশুর হাট বসেছে। এরই মধ্যে পশুর হাটগুলো জমে উঠেছে। প্রতি বছর কোরবানির সময় ঈদের আগে, ঈদের দিন ও তার পরবর্তী সময়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে শুধু কোরবানি করার পর যে বর্জ্য হয় তা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের নানাবিধ চাহিদা ও ভোগের একটি বড় অংশে পরিণত হয়েছে বহুমাত্রিক বর্জ্য ও এর ব্যবস্থাপনা। গৃহস্থালি, শিল্প-কারখানা, মেডিকেল, বাজার, যানবাহনের বিভিন্ন উৎস থেকে কঠিন, তরল ও বায়বীয় বর্জ্য উৎপাদিত হয়। জনসংখ্যাবহুল যেকোনো দেশের জন্য তাই বর্জ্য অনেক জটিল সমস্যা। বছরব্যাপী এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ থাকে। কিন্তু কোরবানির সময় কয়েকদিনের জন্য পশু কোরবানি ও সংশ্লিষ্ট অন্য কারণে যে বর্জ্য উৎপন্ন হয় সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখতে হয়। এক্ষেত্রে পশুর হাটে উৎপন্ন বর্জ্য তো আছেই। সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার আলাদা ব্যবস্থাপনা রাখে। কিন্তু কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ পশু কোরবানির পর যেসব বর্জ্য তৈরি হয় সেগুলো।
পশু কোরবানি ও এর সংশ্লিষ্ট অনেক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পশুর যে অংশ খাওয়া যায় না বা ফেলে দেয়া হয় সে অংশকেই কোরবানির বর্জ্য বলা হয়। পশু জবাইয়ের পর নির্গত রক্ত, পাকস্থলীতে থাকা অপাচ্য খাবার, গোবর, পরিপাকতন্ত্রের অংশ, অপ্রয়োজনীয় হাড়, পায়ের খুর, শিং এমনকি অনেক চর্বিও এর অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে অনেকে নিজে কিংবা মাঠ পর্যায়ের অদক্ষ কর্মীদের দ্বারা জবাই করে। তারপর মাংস, চামড়া, হাড় ও বর্জ্য আলাদা করে থাকে। এ সময় দক্ষ কর্মী চাহিদার অনুপাতে কম থাকে, আবার অনেকে নিজ উদ্যোগেই কাজটি ভালো হবে ভেবে করেন। অনেক সময় অসাবধানতার কারণে মাংসে জীবাণু ছড়ায়। অদক্ষ কর্মীর কারণে মাংস ঠিকভাবে কাটা হয় না। আবার যথাযথ পরিকল্পনার অভাবেও পরিবেশ দূষণ ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঈদের পরবর্তী কদিন ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় নগরীগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে পশু কোরবানি দেয়ায় বর্জ্য জমে থাকে এবং তা নিষ্কাশন করা হয় না। এজন্য চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। বৃষ্টি-বাদলার সময় জমাট পানির সঙ্গে মিশে ভোগান্তি বাড়ায়। পানিদূষণেরও বড় কারণ হয়ে ওঠে। পশু জবাই-পরবর্তী মাংসের উচ্ছিষ্ট অংশ যত্রতত্র ফেলে দেয়ার ফলেও দুই-তিনদিন পর এগুলো পচে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং পরিবেশ দূষণ করে।
অনেক সময় বিভিন্ন পশু বর্জ্য ও চাটাইসমূহ জলাশয় ও পানির ড্রেনেজ লাইনে ফেলে রাখা হয়, পরবর্তী সময়ে যা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত করে। নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে দেশব্যাপী আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিমি খাল, নদী-নালা ও জরাধার খনন ও পুনঃখননের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগ যাতে ব্যাহত না হয় সেজন্য পশু জবাই-পরবর্তী মাংসের উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিক, পলিথিন, চাটাই ইত্যাদি যাতে নালা-খালে-জলাশয়ে ফেলা হয় সেজন্য সবাইকে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। সামনে বর্ষাকাল। কোরবানির ঈদ-পরবর্তী বৃষ্টির পানিতে এসব পশুর বর্জ্য মিশ্রিত হয়ে নোংরা পরিবেশের সঙ্গে মশার উপদ্রবসহ বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এমনিতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে, তার ওপর মশাবাহিত ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে দেশে অবস্থা হবে ভয়াবহ। সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের যথাযথ পদক্ষেপ দ্রুত নিতে হবে।
কোরবানি পশুর বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ঈদুল আজহার আগেই বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা সচেতনতামূলক প্রচারণা ও নির্দেশনা দিয়ে থাকে। এছাড়া সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত বলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চরম অবহেলা দেখা যায়। নগর পরিবেশের অপরিহার্য অংশ হিসেবে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের অধিকাংশ শহর এলাকায় এখনো পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠায় টেকসই নগর পরিবেশ নিশ্চিত করা বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। এজন্য সকল পর্যায় থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কোরবানি পশু ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনার টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি। সচেতনভাবে কোরবানির পশুর বর্জ্যকে যদি সঠিক ব্যবস্থাপনার আনা যায়, তবে পরিবেশ থাকবে নির্মল ও দূষণমুক্ত, জনস্বাস্থ্য থাকবে নিরাপদ এবং কোরবানির পশুর উচ্ছিষ্টাংশকে পরিণত করা সম্ভব হবে সম্পদে। প্রতি বছর কোরবানির পশুর যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয় তা শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ব্যবস্থাপনা করা কঠিন একটি কাজ, এজন্য ব্যক্তি পর্যায়সহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে। কোরবানির পশুর বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট এলাকার পশুর বর্জ্য মাটির নিচে পুঁতে রাখলে বছর খানেক এর মধ্যেই জৈব সার হিসেবে কৃষি ও শস্যক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী হতে পারে। কোরবানি পশুর সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে প্রতি বছর দেশের প্রধান সিটি করপোরেশনগুলোতে এলাকাভিত্তিক পশু বিক্রি ও পশু কোরবানি দেয়ার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় এবং সেসব স্থানে পশু কোরবানি দিতে উৎসাহিত করা হয়, যাতে সহজে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অল্প সময়ের মধ্যে পশু কোরবানির বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ করা যায়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনগুলো আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানি পশুর বর্জ্য পরিবেশসম্মতভাবে ও দ্রুততম সময়ে অপসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। যেমন ডিএনসিসি ঈদুল আজহার দিন দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম দিনের কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে এবং নাগরিকদের মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ, ৪০ লাখ টন ব্লিচিং পাউডার ও ১ লাখ ৫০ হাজার লিটার স্যাভলন বিতরণ শুরু করেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কোরবানি পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর নগরীর জন্য। চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ছুটি বাতিল করে তিন ভাগে বর্জ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৫০টি যান। চট্টগ্রামে বর্ষায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি যাতে না বাড়ে সেজন্য পশুর বর্জ্য নালা বা খালে না ফেলার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
কোরবানি পশুর বর্জ্য পরিবেশসম্মত উপায়ে অপসারণ করতে হলে প্রয়োজন নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি পশু জবাই, পশুর রক্ত দ্রুততম সময়ে মাটিচাপা দেয়া এবং নির্দিষ্ট ব্যাগে উচ্ছিষ্ট অংশসমূহ জমা করতে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া। কোরবানি পশু উন্মুক্ত রাস্তায় বা গলিপথে জবাই না করে এলাকার সবাই একটি নির্দিষ্ট মাঠে কোরবানি পশু জবাই করার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। কোরবানি পশু জবাই করার আগেই পর্যাপ্ত পানি, ঝাড়, ব্লিচিং পাউডার ও বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যাগ সঙ্গে রাখা উচিত। বাংলাদেশের গরুর চামড়া একটি অন্যতম রফতানিযোগ্য জাতীয় সম্পদ। দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ পশুর চামড়া সংগৃহীত হয়, তার অধিকাংশ আসে ঈদুল আজহার কোরবানির পশু থেকে। কিন্তু চামড়া ছাড়ানোর যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় এ জাতীয় সম্পদের গুণগত মান বজায় থাকে না এবং উপরন্তু পার্শ্ববর্তী এলাকায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ে। কোরবানি পশুর চামড়া ও মাংসের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে ধর্মীয় ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানি পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুত বিষয়ে মসজিদের ইমাম ও মাংস প্রস্তুতকারীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। পশুর উচ্ছিষ্ট বর্জ্য বাতাসকে দ্রুত দূষিত করে এবং রোগব্যাধির বিস্তার ঘটায়, বিধায় কোরবানিদাতার প্রথম কাজ হওয়া উচিত পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পশুর বর্জ্য যথাযথ ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা। ধর্মীয় মূল্যবোধকে সমুন্নত রেখে, সুস্থ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় নিয়ে কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সবাইকে সচেতনভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম










