ঢাকার বায়ুদূষণ কোনো নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু সম্প্রতি রাজধানীর বায়ুদূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা হয় দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় থাকছে, নয়তো কাছাকাছি। গত বছরের শেষ মাসজুড়ে এ শহরের বায়ু ছিল খুব বেশি অস্বাস্থ্যকর। ৫ ডিসেম্বর ঢাকার বায়ু দুর্যোগপূর্ণই হয়ে ওঠে। সেদিন সকাল ৯টায় বাতাসের গুণমান সূচকে (একিউআই) স্কোর ৩৯২ নিয়ে ঢাকার বাতাস ছিল সবচেয়ে দূষিত। এরপর একই অবস্থা দাঁড়ায় গত ৯ ডিসেম্বরও। মাস, বছর বদলে গেলেও অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। নতুন বছরের প্রথম দিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্বের ১২৬টি শহরের মধ্যে রাজধানী ঢাকার অবস্থান ছিল অষ্টম। গতকাল তথা জানুয়ারির শেষ দিনেও সকালে বায়ুদূষণে বিশ্বের ১২২টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল চতুর্থ। বায়ুদূষণের এ মান নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার। কিন্তু এ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে গেছে। যদিও উদ্যোগ কম নেয়া হয়নি। তবে তেমন কোনো সুফল মেলেনি। একদিকে অর্থের অপচয় হয়েছে, অন্যদিকে মানুষের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। ঢাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে ঢাকা। অথচ দীর্ঘায়ু ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য পরিবেশগত উপাদান হলো বিশুদ্ধ বায়ু।

বায়ুদূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার মানুষ মাত্র ৪৯ দিন নিরাপদ বাতাসে শ্বাস নিতে পেরেছে। গত বছরের নভেম্বরে ঢাকার মানুষ একদিনও স্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নিতে পারেনি। বায়ুমণ্ডলের অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা সহজেই মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে এবং তা নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করে। ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণের কারণে বছরে ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের আয়ু কমে যাচ্ছে। আর বায়ুদূষণ থেকে যেসব স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হয়, এর মধ্যে গুরুতর হলো শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের সংক্রমণ, কিছু কিছু ক্যান্সার, অ্যালার্জি ইত্যাদি। অতিরিক্ত বায়ুদূষণের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রজননক্ষমতায়। এতে পুরুষের শুক্রাণু তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটছে, শুক্রাণুর মান কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে মেয়েদের ডিম্বাণু কমে যাচ্ছে কিংবা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া বাতাসে সিসার পরিমাণ বেশি হলে তা মস্তিষ্কের ক্ষতি সাধন করে। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা লোপ পায় এর ফলে। শুধু যে মানব শরীরের ক্ষতি হয় এমন নয়, বায়ুদূষণ পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। ক্ষুদ্রাকার কণাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায় এবং একসময় অ্যাসিড বৃষ্টির সূত্রপাত ঘটায়, যা প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতিসাধন করে। এ ভয়াবহতা থেকে নিস্তার লাভ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সবচেয়ে জরুরি বায়ুদূষণের প্রধান খাতগুলো ধরে সমাধানের পথে এগোনো। নয়তো মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়বে।

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণেই বায়ু দূষিত হয়ে থাকে। তবে মানবসৃষ্ট কারণে বর্তমানে বায়ুদূষণ এ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলা যায়। অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, যত্রতত্র গড়ে ওঠা সেকেলে ঘরানার ইটভাটা, ছোট-বড় শিল্প-কারখানা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং ময়লা-আবর্জনা পোড়ানো ইত্যাদি কারণে দূষণ বেড়েই চলেছে। বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের বায়ুদূষণের ৫০ শতাংশেরও বেশি ঘটে শিল্প-কারখানা থেকে। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণও বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রাজধানী ঢাকা। একসময়ের সবুজ নগরী (গ্রিন সিটি) ঢাকা ক্রমান্বয়ে তার সবুজ হারিয়ে হয়েছে ধূসর এক নগরী। এখানে গাছপালা কেটে নতুন নতুন দালানকোঠা নির্মাণ হয়েছে। বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা, বিশেষত ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা। আবার ক্যাপসের গবেষণা অনুযায়ী, এ শহরের আশপাশে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ইটভাটা রয়েছে। আর কলকারখানা তো জালের মতো ছড়িয়ে আছে ঢাকা শহরে। ফলে দূষণ বেড়েই চলছে। বায়ুদূষণ এভাবে চলতে থাকলে মানুষের আয়ুষ্কাল এবং সুস্থ জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।

তাছাড়া কেবল ঢাকা নয়, পুরো দেশেই বায়ুদূষণ একটি গুরুতর সমস্যা। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ারের (এসওজিএ) ২০২৪ সালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়াসহ পূর্ব-পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকার দেশগুলোয় বায়ুদূষণজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। শুধু ২০২১ সালেই বাংলাদেশে ২ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মৃত্যুর কারণ ছিল এই বায়ুদূষণ, যা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো উঠে এসেছে, বাংলাদেশসহ আফ্রিকা ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে লোয়ার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণে পাঁচ বছরের কম বয়সী যত শিশুর মৃত্যু হয়, তার ৪০ শতাংশের জন্যই দায়ী বায়ুদূষণ। ২০২১ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে ১৯ হাজারেরও বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু হয়। ২০২১ সালে বায়ুদূষণ সম্পর্কিত কারণে বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী সাত লাখের বেশি শিশু মারা যায়।

আর এর অন্যতম কারণ হলো ইটভাটা। বায়ুদূষণ হ্রাস করার লক্ষ্যে ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)’ শীর্ষক আইন প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া বায়ুদূষণ রোধ, নিয়ন্ত্রণ ও বায়ুমানের উন্নতি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষায় ‘নির্মল বায়ু আইন ২০২৯’ গৃহীত হয়। দেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক-তে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশ সুরক্ষা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। বায়ুদূষণের বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বলছে, এসব আইন-অনুচ্ছেদের কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই। সুতরাং আইন কার্যকর করতে হবে শুরুতেই। অবৈধ ইটভাটা নিষ্ক্রিয় করতে হবে এবং প্রয়োজনে আধুনিকায়ন করতে হবে; শিল্প-কারখানার মালিকদের বাধ্য করতে হবে বায়ুদূষণ রোধে যথাযথ উদ্যোগ নিতে। মোট কথা, দায়ী খাতগুলোকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এ দূষণ কখনই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। দেশে বায়ুর মান নিয়ে গবেষণা জোরদার করতে হবে, যেন দূষণের মাত্রা আগের চেয়ে বেড়েছে নাকি কমেছে সে সম্পর্কে নিয়মিতভাবে অবগত থাকা যায় এবং সে মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

স্বল্পমেয়াদি হিসেবে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে দূষিত শহরগুলোয় ২-৩ ঘণ্টা পরপর পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা, নির্মাণকাজের সময় নির্মাণ স্থান ঢেকে রাখা, নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের সময় ঢেকে নেয়া, রাস্তায় ধুলা সংগ্রহের জন্য সাকশন ট্রাক ব্যবহার করা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। এছাড়া বনায়ন, ছাদবাগান উৎসাহিত করার জলাধার সংরক্ষণ করাও জরুরি। এ বিষয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত ও সচেতন করতে হবে।

বর্তমান সরকার বায়ুদূষণ রোধে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে এরই মধ্যে। ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস ইটভাটার লাইসেন্স নবায়ন না করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে গত মাসে বায়ুদূষণ রোধে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জানিয়েছেন টাস্কফোর্স ঢাকার রাস্তার ধুলা নিয়ন্ত্রণ, ভাঙা রাস্তা মেরামত এবং আইন প্রয়োগে কাজ করবে। একই সঙ্গে ধুলা, কালো ধোঁয়া, ইটভাটা এবং কলকারখানার দূষণ কমাতেও এটি সক্রিয় থাকবে। এছাড়া গত অক্টোবরে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ নামে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকার বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ ৩০ মাইক্রোগ্রাম কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এখন ৮৬ মাইক্রোগ্রাম। সুতরাং এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। ঢাকার বর্তমান বায়ুমানের প্রেক্ষাপটে দ্রুত এসব কাজের দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রত্যাশা রয়েছে ঢাকার বায়ুমান কমিয়ে সরকার কিছুটা হলেও ঢাকার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে।