গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এছাড়া সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে মানুষের জীবনের অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)’-এ স্বাক্ষর করেছে এবং সে অনুযায়ী ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ নামে একটি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা ৩-এ এফসিটিসি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
তামাক অর্থনীতির জন্যও বড় একটা বোঝা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতির (চিকিৎসা ব্যয় এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদনশীলতা হারানো) পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা একই সময়ে (২০১৭-১৮) তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের (২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা) চেয়ে অনেক বেশি। তামাকের বহুবিধ ক্ষয়ক্ষতি উপলব্ধি করে সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করে।
নিঃসন্দেহে এটি সরকারের বাস্তবসম্মত একটি উদ্যোগ, তবে এ অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ও কৌশলের সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সেই সঙ্গে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করা তথা ‘স্মোকিং ইনসিডেন্স’ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে একদিকে জনসাধারণকে অবহিত ও সচেতন করা প্রয়োজন। অন্যদিকে উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে এফসিটিসির সঙ্গে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ করা আশু প্রয়োজন।
এ কথা সত্য যে তামাক খাত বা তামাকজাত পণ্য থেকে সরকার প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, যা দেশের মোট অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহের প্রায় ১০ শতাংশের বেশি। সাবেক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি তথ্য মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব বিভাগ ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা আয় করে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬২ শতাংশ। আর তামাক খাত থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট রাজস্বের প্রায় ১১ শতাংশ। তার মধ্যে ২৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আসে সিগারেটের মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক থেকে। বোঝাই যাচ্ছে যে দেশের রাজস্ব আয়ে এ খাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে দেশের মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ ধূমপান বা তামাকজাত পণ্য সেবন করেন। তাই তামাকমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে যেকোনো পরিকল্পনা অথবা কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির ‘দ্য ইকোনমিক কস্ট অব টোব্যাকো ইউজ ইন বাংলাদেশ: আ হেলথ কস্ট অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, তামাক ব্যবহারের কারণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, যা সেই বছরের মোট মৃত্যুর ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। একই বছরে প্রায় ১৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত রোগে ভুগেছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শিশু পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৬ শতাংশ খরচ বহন করেছে ব্যবহারকারীর পরিবার আর ২৪ শতাংশ মেটানো হয়েছে জনস্বাস্থ্যের বাজেট থেকে।
তামাক ব্যবহারজনিত অসুস্থতা ও এর কারণে অকালমৃত্যুর ফলে বার্ষিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায় প্রায় ২২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ৩০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, এর বিপরীতে ২০১৮ সালের দামের হিসাবে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপিতে তামাক খাতের অবদান ছিল ২২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এ খাতে অর্থনৈতিক ব্যয়ের চেয়ে আয় কম হয়েছে ৭ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। এ তথ্যকে পাশ কাটিয়ে তামাক কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত প্রচার করা হয় তারা সর্বোচ্চ করদাতা। পরিতাপের বিষয়, এ কর প্রাপ্তির মাশুল হিসাবে সরকারকে কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় মেটাতে হয়, অনেক মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করে এবং মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক ব্যবহারকারীদের তিনটি প্রধান ধরনের অর্থাৎ ফুসফুস, স্বরযন্ত্র ও মুখ ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি ১০৯ শতাংশ বেশি। স্ট্রোক, হৃদরোগ, যক্ষ্মাসহ সাতটি জীবন হুমকির রোগের ঝুঁকি ৫৭ শতাংশ বেশি। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে আচ্ছাদিত কর্মস্থলে কাজ করেন এমন প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। পরোক্ষ ধূমপান মৃত্যু ঘটায় এবং করোনা সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। কাজেই পরোক্ষ ধূমপানের শিকার এ বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
তামাকমুক্ত বা তামাক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কার্যকর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানিতে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে শিশুদের অবহিত করা হয়। ফলে ছোটবেলা থেকেই তারা তামাকবিরোধী মানসিকতা নিয়ে বড় হয়ে ওঠে। আমাদের দেশের স্কুল ও কলেজের পাঠ্যবইয়ে ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কিত পাঠদান এবং বিভিন্ন জনসচেতনতা ও গণশিক্ষার মাধ্যমে ধূমপানের হার কমিয়ে আনতে হবে। বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ, পরিবার, সমাজ ও গণশিক্ষার মাধ্যমে গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সর্বপ্রথম মাঠপর্যায় থেকে তামাকজাত পণ্য নির্মূলের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ২০৪০ সাল নাগাদ তামাকমুক্ত বাংলাদেশ করা কঠিন হবে না।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করতে বিভিন্ন এনজিও বা তামাকবিরোধী সংস্থা প্রায়ই সরকারকে তাগাদা দিয়ে থাকে। কিন্তু সেই সঙ্গে তাদের উচিত সিগারেট ও তামাক ব্যবসায়ী এবং ডিলার কারা, তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান কী তা বিবেচনায় নেয়া, সিগারেট ও তামাক ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা এবং জনসচেতনতামূলক কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা। আরো প্রয়োজন যে আইন রয়েছে তার সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কিনা, মানুষের এ আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা আছে কিনা, কিশোর-তরুণ, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী অর্থাৎ সর্বস্তরের নাগরিক ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’, ধূমপান ও তামাক গ্রহণে ক্ষতি সম্পর্কে অবগত ও সচেতন কিনা, পরিবার-পাঠশালায় শিক্ষার্থীদের প্রতি খেয়াল রাখা হচ্ছে কিনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা এবং প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
জার্মানির মতো আমাদের দেশেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে ধূমপানের ক্ষতিকারক দিকগুলো তুলে ধরে শিক্ষার্থী তথা নতুন প্রজন্মকে সচেতন করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সময়ের চাহিদা। এছাড়া সব হাসপাতাল, ব্যাংক, অফিস-আদালত, বিনোদন কেন্দ্রসহ পাবলিক প্লেসগুলোয় তামাকের ক্ষতি ও আইনবিষয়ক সচেতনতা ক্যাম্পেইনসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করা, অবৈধ তামাক বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে গ্রে প্রডাক্ট সিন্ডিকেট দমন করা প্রয়োজন। প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম জোরদার করা অতীব জরুরি।
বিক্রয় কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্যের আগ্রাসী বিজ্ঞাপন প্রদর্শন বন্ধ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো উদ্যোগী হয়ে তামাকের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও স্পন্সরশিপের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং তা কার্যকর করা। এর মধ্যে রয়েছে বিক্রয় কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্য বিজ্ঞাপন প্রদর্শনসহ সব ধরনের বিজ্ঞাপনসামগ্রী প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায়, বিশেষ করে তরুণদের ধূমপান থেকে নিরুৎসাহ করতে বিদ্যমান তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০০৫ সংশোধন করে বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শনসহ সব ধরনের বিজ্ঞাপন সুনির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা। প্রান্তিক পর্যায় থেকে সর্বস্তরে তামাকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি ও বৃদ্ধি, অবৈধ বাণিজ্য উচ্ছেদ, যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।
সিকদার আনোয়ার: কৃষি অর্থনীতিবিদ, সাবেক সচিব










