দেশে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সংকট তীব্র। এ কারণে শিল্প ও আবাসন খাতের নানা কার্যক্রম প্রতিনিয়তই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করেও মোট চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। বরং উচ্চ মূল্যে আমদানীকৃত গ্যাস ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে যে আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয় সেটি পূরণে সরকারকে দিতে হয় বিপুল অংকের ভর্তুকি। এমন পরিস্থিতিতে বিতরণকালে কারিগরি ত্রুটি, অবৈধ সংযোগ ও চুরির কারণে (সিস্টেম লস) বিপুল পরিমাণ গ্যাস নষ্ট হওয়াটা উদ্বেগের। অথচ গ্যাস সংযোগে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করা, অবৈধ সংযোগ দেয়া, মিটার টেম্পারিং করা, কম গ্যাস সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো এবং বাণিজ্যিক গ্রাহককে শিল্প শ্রেণীর গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিরও ব্যয় বেড়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত গ্যাস খাতে সিস্টেম লস (সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে) দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৪ শতাংশে। আর সেই গ্যাসের পরিমাণ ১ হাজার ৪৫১ মিলিয়ন ঘনমিটার। গ্যাসের ভারিত গড়ের হিসাব ধরলে এর আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থবছরের পুরো হিসাব ধরলে এ ক্ষতি প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর আগের অর্থাৎ ২০২৩-২৪ পেট্রোবাংলার বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লসে গ্যাস অপচয় ও চুরি যায় ২ হাজার ৩৬ মিলিয়ন ঘনমিটার, আর্থিক হিসাবে যা ৩ হাজার ৭৮৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এদিকে গত এপ্রিলে গ্যাসের সিস্টেম লস কমাতে পথনকশা প্রণয়ন করেছে জ্বালানি বিভাগ। সেখানে সিস্টেম লসের একটা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও এ লক্ষ্যমাত্রা তিতাস ও বাখরাবাদ কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পুরনো পাইপলাইন ও অবৈধ সংযোগ বিবেচনায় তিতাস ও বাখরাবাদের সিস্টেম লস সর্বনিম্ন ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। বলা বাহুল্য, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা দক্ষ করা ছাড়া সিস্টেম লস কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে। গ্যাস বিতরণকারী রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো চাইলে সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা গ্যাস চুরি বন্ধ করা কঠিন কিছু নয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা প্রয়োজন। কারণ কোম্পানির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অবৈধ সংযোগের বিস্তার ঘটার অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করতে হবে, যেমন গত জানুয়ারিতে গাজীপুরের কাশিমপুরে তিতাসের অভিযানে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকার গ্যাসের অবৈধ বিতরণ লাইন উচ্ছেদ, ৪৫০টি অবৈধ আবাসিক গ্যাস বার্নারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও ৫০০ মিটার পাইপ অপসারণ করা হয়েছিল। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) উদ্যোগী হয়ে গত ৯ মার্চ ঢাকার ধানমন্ডিতে দুটি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। তবে কেবল অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই সফলতা আসবে না। ওই স্থান কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে, যাতে গ্যাস চোর চক্র পুনঃসংযোগ না নিতে পারে। সারা দেশে কয়েক লাখ অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর এসব সংযোগ চলছে, যা রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতি। সেই সঙ্গে ভোক্তার ওপরও আর্থিক চাপ বাড়ছে। কারণ রাষ্ট্রীয় সংস্থা তাদের লোকসান পুষিয়ে নিতে বহুবার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। সুতরাং সরকার ও জনগণের ওপর এ আর্থিক চাপ হ্রাস এবং অপর্যাপ্ত গ্যাসের বৈধ ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা প্রয়োজন। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ভাষ্য, বর্তমানে যে পরিমাণ সিস্টেম লস হয়, তার আর্থিক মূল্য ১০০ কোটি ডলার। আগামী বছরের জুনের মধ্যে এপ্রিলে প্রণীত পথনকশা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিস্টেম লস অর্ধেকে নেমে এলে অন্তত ৫০ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে, বাজারমূল্যে যার পরিমাণ ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
অবৈধ সংযোগ বা চুরি বন্ধ করতে যেমন তদারকি জোরদার করা আবশ্যক, তেমনি সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণে গ্যাস খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। কেননা কারিগরি ত্রুটি ও অপরিকল্পিত পাইপলাইন নির্মাণের কারণেও গ্যাস খাতে সিস্টেম লসের পরিমাণ অনেক বেশি, যা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার আর দক্ষতা নিশ্চিতের মাধ্যমে অন্তত ৩-৪ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। গ্যাস খাতে সিস্টেম লস কমাতে এরই মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদসহ পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রধান পাঁচটি শহরে পাঁচ বছর আগে গ্যাসের সিস্টেম লস (সঞ্চালন ও ডিস্ট্রিবিউশন) ছিল গড়ে ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। মূলত পাইপলাইন লিকেজ, চুরি ও কারিগরি ত্রুটির কারণে এটি হতো। তাই গ্যাস খাতে আর্থিক ক্ষতি কমাতে এ পাঁচ শহরে ১ হাজার ৪৭০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করে পাকিস্তান সরকার। গ্যাস রক্ষণাবেক্ষণে বসানো হয় টাউন বর্ডার স্টেশন (টিবিএস)। এতে শহরগুলোয় গ্যাসের সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। টিবিএস প্রযুক্তি পুরনো পাইপলাইনে লিকেজ চিহ্নিতকরণ, চুরি বন্ধ করা, ছোট এলাকায় লিকেজ মেরামত এবং গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ শনাক্ত করতে বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশকে গ্যাস খাতে সিস্টেম লস কমাতে হলে এ ধরনের আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দেশে পাইপলাইনে গ্যাস বিতরণ করে ছয়টি কোম্পানি। এসব কোম্পানির মধ্যে বেশির ভাগ গ্রাহক তিতাসের। এর বাইরে বাকি পাঁচটি কোম্পানির গ্রাহক সংখ্যা সীমিত। সর্বোপরি সব বিতরণ কোম্পানিকে তৎপর হতে হবে গ্যাস খাতে সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে।










