আইকনিক পোশাক নীল স্যুট ও লাল টাই পরে মঞ্চে উঠলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঞ্চে উঠেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। প্রথমে জেলেনস্কির পোশাক নিয়ে ঝগড়া হলেও পরে জেলেনস্কির দিকে জলভরা খেলনা বন্দুক ছুড়ে দেন ট্রাম্প। পুরো ঘটনাটিই ঘটেছে ক্যান্টোনিজ অপেরা প্রদর্শনীতে।
এই অপেরার নাম ‘ট্রাম্প, দ্য টুইনস প্রেসিডেন্ট’, যা চীনের শত শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী অপেরা শৈলীর এক আধুনিক ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক রূপান্তর। এই প্রযোজনাটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল ২০১৯ সালে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে। এরপর এটি একাধিকবার মঞ্চস্থ হয়েছে। এবারের সর্বশেষ সংস্করণে শুধু জেলেনস্কির সঙ্গে কৌতুক নয়, বরং রয়েছে পেনসিলভানিয়ায় ট্রাম্পের ওপর হওয়া হত্যাচেষ্টার নাট্যরূপ এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইলন মাস্কের সঙ্গে তার বিতর্কিত সম্পর্কের ইঙ্গিতও।

এই তিন ঘণ্টা বিশ মিনিট দীর্ঘ নাটক শুরু হয় ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কার একটি স্বপ্ন দিয়ে। যেখানে দেখা যায় তার বাবার এক কল্পিত জমজ ভাই রয়েছে চীনে, যার নাম ‘চুয়ান পু’ (মান্দারিন ভাষায় ট্রাম্পের প্রতিশব্দ)। ট্রাম্প যখন পুনর্নির্বাচনের প্রচারণায় ব্যস্ত, তখন এলিয়েনরা তাকে মঙ্গলগ্রহে অপহরণ করে। এ অবস্থায় ইভাঙ্কা চুয়ানকে অনুরোধ করেন ট্রাম্পের ভূমিকায় অভিনয় করতে যাতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেও আমেরিকা স্থিতিশীল থাকে।
এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রযোজনাটি লিখেছেন ক্যান্টোনিজ অপেরা সুরকার ও পেশাদার ফেং শুই মাস্টার এডওয়ার্ড লি কুই-মিং। তিনি বলেন, ‘এটি একটি কমেডি, যা দেখায় কীভাবে ট্রাম্পের প্রভাব বিশ্বব্যাপী মানুষকে প্রভাবিত করে। এমন একজন প্রভাবশালী মানুষকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছি।’
ইউনেস্কো স্বীকৃত এই প্রাচীন শিল্পধারাটি একসময় হংকংয়ের প্রধান বিনোদন মাধ্যম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ হারিয়েছে। লি ও তার দল এই ঐতিহ্যকে আধুনিক ছোঁয়ায় তরুণদের কাছে জনপ্রিয় করতে চান। সে কারণেই ট্রাম্পকে ‘নতুন নায়ক’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তারা।
এতে ট্রাম্পের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা লুং কুন-টিন। সোনালি উইগ আর কৃত্রিম ভ্রু’তে তিনি ট্রাম্পের মুখাবয়ব ও অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ করেন তিনি। লুং বলেন, ‘প্রতিবার আমি যখন মঞ্চে উঠি, তখন আমি নিজেকে সত্যিই ট্রাম্প ভাবি।’
অপেরাটিতে আব্রাহাম লিংকন, রিচার্ড নিক্সন, চীনের মাও সে তুং ও উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের মতো নেতারাও উঠে এসেছে। এদের সবাইকে এই কল্পনার রাজনৈতিক নাট্যপ্রবাহে অংশ হিসেবে দেখা যায়।
লি জানান, হাস্যরস ও বিদ্রূপের সীমা রক্ষা করে সবাইকে সংযুক্ত করা তার প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনা নয় বরং ভারসাম্য রক্ষা করে ভালোবাসা ও শান্তি ছড়িয়ে দেয়াই ছিল তার নাটকের মূল ভাবনা।
১৯৫০ থেকে ৬০-এর দশকে হংকংয়ের প্রধান বিনোদন ছিল কান্টোনিজ অপেরা। ৫০০ বছরের পুরোনো এই শিল্পে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, মেকাপ ও ক্ল্যাসিক কাহিনি থাকে। ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে এটি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। এই অপেরার মাধ্যমে তরুণদের আগ্রহ ফেরাতে চেয়েছেন লি। তাই ট্রাম্পকে বেছে নিয়েছেন তিনি। সেইসঙ্গে নাটকে ঢোকানো হয়েছে আধুনিক থিয়েটারের উপাদানও।
নাটকটি তরুণরা সাদরেই গ্রহণ করেছে। মঞ্চজুড়ে দর্শকদের হাসি ও করতালিতে ভরে ওঠে পরিবেশ। ১৬ বছর বয়সী আদিভা ঝেং বলেন, ‘ইউক্রেন, আমেরিকা ও চীনের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে একত্র করে এই অপেরা যা করেছে, তা আমাকে আকৃষ্ট করেছে।’
লি জানিয়েছেন, তিনি এই প্রযোজনাটি ব্রডওয়েতেও মঞ্চস্থ করতে চান, তবে অর্থ ও সংগঠনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিনি আশা করেন, ট্রাম্প ও জেলেনস্কি—দুজনেই এই কাজের প্রশংসা করবেন, কারণ তারা দু’জনই রাজনীতিতে আসার আগে শোবিজ দুনিয়ার তারকা ছিলেন। ট্রাম্প ছিলেন ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’ রিয়্যালিটি শোর হোস্ট, আর জেলেনস্কি জনপ্রিয় ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গধর্মী নাটক ‘সারভেন্ট অভ দ্য পিপল’-এ প্রেসিডেন্টের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
লি বলেন, ‘নাটক মানেই জীবন। জীবন মানেই নাটক। এমনকি রাজনীতিও এক ধরনের নাটক।’
সিএনএন অবলম্বনে










