বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আজ এক সংকটময় সময়ে দাঁড়িয়ে। একসময় লাখো দর্শকের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ শিল্প, কিন্তু বর্তমানে পেশাদার প্রযোজনা সংস্থা অভাব পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রডাকশন হাউজের ওপর নির্ভরতা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ঘাটতি সিনেমার মানহীনতা, দর্শক আগ্রহ কমে যাওয়া এসব সমস্যার জন্ম দিয়েছে পুরো সিনে পাড়ায়। পেশাদার প্রযোজনা সংস্থার অভাব এখন পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে
হারানো সময়ের গৌরব
একসময় ঢালিউডে ছিল নামকরা কিছু প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, যাদের সিনেমা মানেই ছিল গুণগত নিশ্চয়তা। আনন্দমেলা কথাচিত্রের ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ আজও বাংলাদেশের সিনেমা ইতিহাসে এক মাইলফলক। তখনকার প্রযোজকরা শুধু ব্যবসা নয়, শিল্পের মর্যাদা ও নান্দনিকতাকেও গুরুত্ব দিতেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে সে পেশাদারত্ব। আজকের অধিকাংশ সংস্থা নির্ভর করে একক মালিকের ইচ্ছা ও সামর্থ্যের ওপর।
চলচ্চিত্র গবেষক বিধান রিবেরু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলচ্চিত্র একটি সমন্বিত শিল্প। শুধু প্রযোজনা ব্যবস্থাপনাকে উন্নত ও পেশাদারি করা যথেষ্ট নয়; চিত্রনাট্য ও পরিচালনাকেও সমানভাবে চৌকস হতে হবে। কল্পনাশক্তিকে আরো প্রখর করতে যথাযথ প্রস্তুতি প্রয়োজন। যদিও আমাদের দেশে অর্থ ও জ্ঞান সীমিত, তবু শিল্পীরা কাজ করে যাচ্ছেন এবং অনেক ভালো মানের কাজ উপহার দিচ্ছেন, যদিও সে কাজের সংখ্যা সীমিত। বাংলাদেশ সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (বিসিটিআই) এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে পারত।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এদেশের চলচ্চিত্র প্রযোজনা ব্যবস্থায় এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গড়ে ওঠেনি। উন্নত বিশ্বের চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানগুলো প্যারামাউন্ট পিকচারস, ডিজনি, ওয়ার্নার ব্রাদার্স বছরের পর বছর ধরে গড়ে তুলেছে এমন কাঠামো, যেখানে গবেষণা, বাজেট পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ ও দর্শক চাহিদা মূল্যায়ন সবই থাকে সুসংগঠিতভাবে। ওটিটি দুনিয়ায়ও একই ধারা নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজন স্টুডিও প্রতিটি প্রজেক্টে গড়ে তোলে আলাদা টিম, যারা গল্প উন্নয়ন থেকে পোস্ট প্রডাকশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই কাজ করে পরিকল্পিতভাবে। তাই তাদের সিনেমা যেমন বাণিজ্যিকভাবে সফল, তেমনি শিল্পমানেও প্রশংসিত বিশ্বজুড়ে।
বলিউড হতে পারে উদাহরণ
প্রতিবেশী ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পও শেখার মতো একটি উদাহরণ। বলিউডের বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলো—বানসালি প্রডাকশনস, যশরাজ ফিল্মস, ধর্মা প্রডাকশনস প্রতিটি সিনেমা নির্মাণে রাখে আলাদা পরিকল্পনা ও টিম। সঞ্জয় লীলা বানসালির বাজিরাও মস্তানি, পদ্মাবতী, গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি সব সিনেমাই সে পেশাদার কাঠামোর সফল ফল। পরিচালকরা শুধুই সৃজনশীল দিকটি দেখেন। বাজেট, প্রযুক্তি ও বিপণনের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান সামলায়। এ ভারসাম্যই শিল্প ও বাণিজ্যের মেলবন্ধন তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে প্রযোজনার বাস্তবতা
চরকির সিইও, পরিচালক ও প্রযোজক রেদওয়ান রনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সিনেমা প্রযোজনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রফেশনাল প্রডিউসার রোলের অভাব। যিনি সিনেমার জন্য টাকা দেন, তিনি প্রডিউসার নন। প্রডিউসার হলেন সে ব্যক্তি, যিনি পুরো সিনেমা বা সিরিজের প্রযোজনা তত্ত্বাবধানে থাকেন। বাজেট ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে শুটিং ও সম্পাদনার প্রতিটি ধাপ প্রডিউসারের তত্ত্বাবধানে হবে। আমাদের দেশে যিনি টাকা দেন, তাকে প্রডিউসার ধরা হয়। এ ভুল ধারণার কারণে প্রডিউসারের আসল রোল হারিয়ে গেছে এবং পরিচালক ও সহকারী পরিচালকদের ওপর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চাপছে।’
রনি জানান, প্রযোজনা সংস্থাগুলোর কাঠামোয় তিনটি মূল রোল আছে প্রডিউসার, এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার ও লাইন প্রডিউসার। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে লাইন প্রডিউসারের কাজ কিছুটা বিদ্যমান, আমরা তাকে প্রডাকশন ম্যানেজার বলি। তবে প্রডিউসার ও এক্সিকিউটিভ প্রডিউসারের কাজ পরিষ্কার নয়, যার কারণে ইন্ডাস্ট্রিটি সঠিকভাবে এগোতে পারছে না।’
সরকারি সহায়তা: প্রয়োগে ঘাটতি
সরকার প্রতি বছরই চলচ্চিত্র খাতে অনুদান দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো সে অনুদানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও বাস্তব প্রয়োগে। অনেক সিনেমা অনুদান পেলেও শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায় না, আবার কিছু সিনেমা মানহীন বা অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেমে যায় পেশাদার প্রযোজনা ব্যবস্থার অভাবে।
সীমাবদ্ধতার ভেতরও আশার আলো
দেশে কিছু করপোরেট সংস্থা কাজ করছে, যদিও সীমিত পরিসরে। কয়েকটি প্রযোজনা সংস্থা একসময় নতুন ধারার সূচনা করেছিল, কিন্তু বর্তমানে তাদের নির্মাণ সংখ্যা সীমিত। তবে ডিজিটাল প্লাটফর্মের উত্থান নতুন আশা জাগাচ্ছে। চরকি, আইফা প্রডাকশনস, বেঙ্গল মাল্টিমিডিয়া নিয়মিত মানসম্মত ওয়েব ফিল্ম ও সিরিজ প্রযোজনা করছে। চরকি দেখিয়েছে, পেশাদার কাঠামো থাকলে দেশীয় নির্মাণও আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছতে পারে।
ভবিষ্যতের প্রত্যাশা ও সমাধান
চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। রেদওয়ান রনি বলেন, ‘যিনি লগ্নি করবেন তাকে অবশ্যই জানতে হবে সিনেমার প্রডিউসিং রোলগুলো কী। যিনি প্রযোজক হবেন, তাকে অবশ্যই প্রযোজনা ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে দেশের প্রযোজনা সংস্থাগুলোর বর্তমান সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করা সম্ভব হবে।’
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বড় করপোরেট বিনিয়োগ ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে চলচ্চিত্র খাতে কর্মসংস্থান বাড়বে। প্রতিটি বিভাগে তৈরি হবে পেশাদার কর্মপরিবেশ। প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও আসবে নতুন গতি। এমন কাঠামো তৈরি হলে দেশীয় সিনেমা শুধু স্থানীয় দর্শকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ওটিটি প্লাটফর্ম ও বৈশ্বিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারবে।










