তিনি জীবদ্দশায় প্রায় অচেনা ছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন এক বিস্ময়কর কিংবদন্তি। তার গল্প শুধু সংগীতের নয়—এটি প্রতিভা, একাকিত্ব, সামাজিক সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং এক রহস্যময় নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কাহিনী।

কনি কনভার্স ছিলেন এক স্বশিক্ষিত গীতিকার ও সুরকার। তিনি ১৯৫০-এর দশকের নিউইয়র্কে ছোট অ্যাপার্টমেন্টে বসে গান লিখতেন আর রেকর্ড করতেন। তখনকার লোকসংগীতের জগৎ ছিল সরল প্রেম ও ঐতিহ্যনির্ভর বিষয়প্রধান। সে বাস্তবতায় কনি কনভার্স এনেছিলেন গভীর আত্মবিশ্লেষণ, শহুরে একাকিত্ব, নারীর স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের জটিল প্রশ্ন। তার গানগুলো শুনলে আজকের আধুনিক ইন্ডি-ফোক (আধুনিক লোকসংগীতের একটি শাখা) ধারার শিল্পীদের কথা মনে পড়ে।

তার অন্যতম আলোচিত গান ‘রভিং উইমেন’ এক স্বাধীনচেতা নারীর গল্প বলে, যে সমাজের নিয়ম ভেঙে নিজের জীবন নিজেই বেছে নেয়। গানের আবহ, গিটার বাজানোর ধরন ও কণ্ঠস্বর এতটাই আধুনিক যে অনেক শ্রোতা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেন না এটি ১৯৫০-এর দশকের সৃষ্টি। অথচ এ গান রেকর্ড করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৭০ বছরেরও আগে।

12

কনি কখনই অ্যালবাম তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও বাজারজাতের জন্য বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হননি। তিনি ছিলেন একেবারেই স্বনির্ভর শিল্পী। নিজের সামান্য গিটার আর সাধারণ রেকর্ডিং যন্ত্র দিয়ে এমন সব গান তৈরি করতেন, যা তার সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক, কাব্যিক ও চিন্তাশীল ছিল। বব ডিলানের আগেই কনি একক গীতিকার ও শিল্পী ধারার পথ তৈরি করছিলেন। কিন্তু সমকালীন কোম্পানিগুলো তার জটিল ও গভীর গান গ্রহণ করেনি। ফলে ধীরে ধীরে তিনি সংগীত জগৎ থেকে সরে যান। এভাবে তার প্রতিভা দীর্ঘ সময় আড়ালেই রয়ে যায়।

তার জীবন আরো রহস্যময় হয়ে ওঠে ১৯৭৪ সালে। বয়স তখন ৫০ বছর। হঠাৎ করেই তিনি স্বাভাবিক জীবন থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। পরিবার ও কাছের মানুষের কাছে লেখা এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি জীবনে কোথাও ‘নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি।’ এর পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। কেউ মনে করেন, তিনি কানাডায় চলে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই দুর্ঘটনায় মারা যান। আবার কেউ বিশ্বাস করেন, তিনি ব্রাজিল বা অন্য কোনো দেশে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু সত্য আজ পর্যন্ত অজানা ও রহস্যই থেকে গেছে।

বহু বছর পর ২০০৪ সালে তার পুরনো কিছু রেকর্ডিং আবার আলোচনায় আসে। প্রযোজক জিন ডেইচ তার গান রেডিওতে প্রচার করলে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর ২০০৯ সালে প্রকাশ হয় সংকলন অ্যালবাম ‘হাও সেড, হাও লাভলি’, যা তাকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেয়। দ্রুতই গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। কনির এ গানগুলো এতটাই অগ্রসর ছিল যে অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি যে এগুলো ১৯৫০-এর দশকের। লেখক হাওয়ার্ড ফিশম্যান বলেন, ‘তার গান অত্যন্ত আধুনিক ও সময়ের বাইরে মনে হয়।’

তার ‘ট্রাবল’ গানে প্রকৃতির কাছে গিয়ে কান্না শেখার মতো একটি অনুভূতির কথা বলা হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে জনি ক্যাশের গানেও দেখা যায়। আবার তার গানের ভাষা ও গঠন অনেকাংশে পরবর্তী সময়ের স্কটল্যান্ডের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় ব্যান্ড কক্টো টুইনসের সংগীতধারার আগাম ইঙ্গিত দেয়।

আজকের সংগীতবোদ্ধা ও সমালোচকরা মনে করেন, কনি কনভার্স তার সময়ের চেয়ে বহু এগিয়ে ছিলেন। তার গানে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সমাজের বাইরে দাঁড়িয়ে জীবন দেখার যে সাহস ছিল, তা সেই যুগে প্রায় অচিন্তনীয় ছিল। এ কারণেই তার গানগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

আধুনিক অনেক শিল্পীও তার প্রভাব স্বীকার করেন। তাদের মতে, কনির সংগীত শুধু গান নয়, বরং একধরনের আত্মজীবনীমূলক অভিজ্ঞতা, যেখানে প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা ও মানবিক অনুভূতি একসঙ্গে মিশে গেছে। তার গানগুলো শুনলে মনে হয়, তিনি সময়ের অনেক আগে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের মানুষের জন্য কিছু বার্তা রেখে গেছেন। বিবিসি অবলম্বনে বাশার খান