ভারতের সিনেমার অন্যতম কিংবদন্তি দেব আনন্দ। তাকে দেখার জন্য একসময় তরুণীরা লাইন দিয়ে অপেক্ষা করতেন। কিন্তু দেব আনন্দের শুরুটা ছিল সংগ্রামের। একেবারে খালি হাতেই তিনি গিয়েছিলেন বলিউডে। সঙ্গে ছিল মাত্র ৩০ রুপি। সেখান থেকেই একসময় পরিণত হন বলিউডের সুপারস্টারে।

খ্যাতি ও সম্পদ সবসময় মানুষকে আকৃষ্ট করে। আর খ্যাতিলাভের একটি বড় জায়গা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি। চল্লিশ দশকের ভারতে সিনেমার তারকা হওয়াটাই ছিল খ্যাতি অর্জন ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করার অন্যতম পথ। তখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে তরুণ-তরুণীরা এ স্বপ্নে বিভোর হয়ে ছুটে যেত। দেব আনন্দ ছিলেন তেমনই একজন। তিনি বড় স্বপ্ন আর সামান্য পুঁজি নিয়ে লাহোর থেকে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) গিয়েছিলেন।

সেই সময়ে সিনেমা সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল একেবারেই প্রাথমিক। কেউ যদি বলত সে তারকা হতে চায়, তাহলে সেটির মানে এই ছিল না যে সে ভালো অভিনয় জানে। বরং ভাবা হতো দেখতে ভালো ও আকর্ষণীয় হলেই সিনেমার জন্য উপযুক্ত।

দেব আনন্দের স্বপ্নের শুরুটা ছিল ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করার ইচ্ছা নিয়ে, কিন্তু ভাগ্য তাকে এমন এক পথে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি কিছু অর্জন করেন। নিজের স্মৃতিকথা রোমান্সিং উইথ লাইফ-এ দেব আনন্দ লিখেছেন, তার আট ভাইবোন ছিল এবং তার বাবা সবাইকে ভালো শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেব বড় হওয়ার আগেই তাদের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।

দেব আনন্দ লিখলেন, ‘তার (বাবার) পক্ষে আর্থিক দিক দিয়ে আমার মতো তৃতীয় ছেলের উচ্চশিক্ষার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর তাই তিনি আমাকে একটি ব্যাংকে কেরানির চাকরি করতে বলেন। এর আগে আমি ব্রিটিশ বাহিনীর রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে কমিশনের জন্য আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হই।’

দেব লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন এবং নিজেকে এত নিচু পদের উপযুক্ত মনে করেননি। তাই তিনি বম্বে চলে আসেন সিনেমায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে। তিনি লিখেছেন, ‘সে সময় আমার সঙ্গে ছিল ৩০ টাকা আর এক ছোট ব্যাগভর্তি আমার প্রিয় কিছু জিনিসপত্র।’

বম্বে এসে দেব ছিলেন বেকার এবং অনেক সময় অনাহারেও দিন কাটাতে হয়েছে। তিনি এক স্টুডিও থেকে অন্য স্টুডিও ঘুরে বেড়াতেন যেন কারো নজরে পড়তে পারেন। সেখানে কাজ করা মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য জনপ্রিয় গান গাইতেন। কিছু সময় তিনি খাজা আহমদ আব্বাসের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু চিত্রনাট্যকার, সাংবাদিক আব্বাসের দয়ায় বেশি দিন কাটাতে চাননি দেব। তাই তিনি একটি চওলে (খুপরি ঘরওয়ালা বস্তিমতো জায়গা) উঠে যান।

আর্থিক অবস্থা এতটা খারাপ হয়ে পড়ে যে নিজের ডাকটিকিটের সংগ্রহ বিক্রি করে দেন দেব আনন্দ। সে সময় তিনি ঘর নেন পারেলের কৃষ্ণ নিবাস নামের আরেকটি চওলে। কিছুদিন পর বান্দ্রায় ঘর নেন। তার ভাই চেতন আনন্দ এমন সময় মুম্বাই এলে তিনিও দেবের ঘরে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে বাধ্য হয়ে দেব ৮৫ রুপিতে একটি হিসাবরক্ষণ সংস্থায় কেরানির কাজ নেন। বিষয়টিকে তিনি ‘অপমানজনক’ মনে করলেও জীবনযাপনের জন্য চাকরিটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

পরবর্তী চাকরি ছিল ব্রিটিশ সরকারের সেন্সরশিপ বিভাগে। এতে সেনাবাহিনীর চিঠিপত্র স্ক্যান করার জন্য শিক্ষিত তরুণদের নিযুক্ত করা হতো। এ চাকরিতে তিনি কিছুদিন ছিলেন এবং পরে তার মাসিক বেতন বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়। কিন্তু এ চাকরিটাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, কারণ এটা তার সিনেমার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিজের স্মৃতিকথায় দেব লিখেছেন, একদিন একটি চিঠি পড়তে পড়তে তিনি দেখেন এক ভারতীয় সেনা তার স্ত্রীকে লিখেছেন, ‘ইচ্ছা করে এই চাকরি ছেড়ে এখনই তোমার কোলে গিয়ে পড়ি।’ সেই মুহূর্তেই দেব চাকরি ছেড়ে দেন এবং অফিস থেকে বেরিয়ে যান।

এ ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সিনেমায় প্রথম সুযোগ পান। তারপর আর কখনো ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে উপহার দিয়েছেন কালজয়ী অনেক সিনেমা। নায়ক থেকে হয়েছেন প্রযোজক, পরিচালক আর ভারতের সিনেমার অন্যতম কিংবদন্তি। —দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে আসরার আবেদিন