ওয়ার্নার ব্রাদার্সের স্ট্রিমিংয়ের মালিকানা কিনছে নেটফ্লিক্স। এর মাধ্যমে সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম নেটফ্লিক্সের অধীনে আসছে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির টিভি ও ফিল্ম, এলএইচবিও ম্যাক্স ও এইচবিওর স্ট্রিমিং স্বত্ত্ব। ফলে পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিনোদন শক্তি এবার যাচ্ছে নেটফ্লিক্সের হাতে।
গত শুক্রবার নেটফ্লিক্স ৭২ বিলিয়ন ডলারে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির টিভি, চলচ্চিত্র স্টুডিও ও স্ট্রিমিং বিভাগ কেনার বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় দাঁড়ায় ৮ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ চুক্তির মাধ্যমে হলিউডের অন্যতম মূল্যবান ও প্রাচীন সম্পদের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে স্ট্রিমিং অগ্রদূত নেটফ্লিক্সের হাতে। এর আগে কয়েক সপ্তাহব্যাপী নিলামে নেটফ্লিক্স ও প্যারামাউন্ট-স্কাইড্যান্সের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে।
নেটফ্লিক্সের চুক্তি অনুযায়ী, ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির প্রতিটি শেয়ারহোল্ডার প্রতি শেয়ারের বিপরীতে ২৩ দশমিক ২৫ ডলার নগদ ও প্রায় ৪ দশমিক ৫ শূন্য ডলার মূল্যের শেয়ার পাবেন নেটফ্লিক্স। এতে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের শেয়ারের মূল্য দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৭৫ ডলার, যা কোম্পানির শেয়ার-ভিত্তিক মালিকানা মূল্য হিসেবে প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলার এবং ঋণসহ মোট ৮২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
নেটফ্লিক্স জানিয়েছে, চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর তৃতীয় বছরের মধ্যে তারা বছরে অন্তত ২-৩ বিলিয়ন ডলার খরচ সাশ্রয় করতে পারবে বলে আশা করছে। এছাড়া চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হলে ওয়ার্নারের প্রধান নির্বাহী ডেভিড জাসলাভও পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন।
বিনোদন দুনিয়ায় প্রভাব
এ চুক্তির ফলে নেটফ্লিক্স ‘গেম অব থ্রোনস’, ‘ডিসি কমিকস’ ও ‘হ্যারি পটার’-এর মতো আইকনিক ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা পাবে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে এ ঘটনায় উদ্বেগ বাড়বে। কারণ নেটফ্লিক্সের হাতে খুব বেশি শক্তি, কনটেন্ট, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ক্রয়ের ক্ষমতা চলে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেটফ্লিক্সের কেনার ক্ষমতা আরো বাড়াবে। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে হলিউডে একটি প্রভাবশালী শক্তি হয়ে উঠেছে।
অবশ্য নেটফ্লিক্স বলেছে, চুক্তিটি নতুন কর্মসংস্থান ও প্রতিভাবানদের জন্য আরো সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে কীভাবে তা সম্ভব হবে, এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি কোম্পানির প্রতিনিধিরা।
এ বিষয়ে ওয়ার্নার মিডিয়ার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেসন কিলার এক্সে দেয়া একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘যদি আমাকে এমনটি করতে বলা হতো, আমি তা ভাবতেই পারতাম না। কারণ ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে নেটফ্লিক্সের কাছে বিক্রি করা মানে প্রতিযোগিতা কমিয়ে ফেলা।’
স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড (এসএজি-এএফটিআরএ) আল জাজিরাকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘নেটফ্লিক্স ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স চুক্তি এমন একীভূত করার ঘটনা, যা দুই কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের আর্থিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। কিন্তু বিনোদন শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এটি গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে, বিশেষ মানব সৃজনশীল প্রতিভা (যাদের জীবিকা ও ক্যারিয়ার এর ওপর নির্ভরশীল) হুমকিতে ফেলবে।’
দুটি কোম্পানি এক হয়ে যাওয়ার ঘটনায় এইচবিও ম্যাক্সের ১২৮ মিলিয়ন গ্রাহক যুক্ত হবে নেটফ্লিক্সের ৩০ কোটিরও বেশি গ্রাহকের সঙ্গে। এতে একটি দুর্দান্ত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে।
গ্লোবাল প্রদর্শনী ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন ‘সিনেমা ইউনাইটেড’ তাদের মন্তব্যে বলেছে, ‘এ চুক্তি বিশ্বব্যাপী সিনেমা হলগুলোর জন্য অভিনব হুমকি তৈরি করছে।’
পিপি ফোরসাইটের বিশ্লেষক পাওলো পেস্কাতোরে রয়টার্সকে দেয়া এক মন্তব্যে বলেছেন, ‘বর্তমান নিয়ন্ত্রক পরিবেশ বিবেচনায় এটি অবশ্যই উদ্বেগ ও প্রশ্ন তুলবে। একীভূত এ প্রভাবশালী স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানকে কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত।’
ওয়াশিংটনের কঠোর নজরদারি
নিলাম জমা দেয়ার আগেই কংগ্রেসের কিছু সদস্য বলেছিলেন, নেটফ্লিক্স ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির চুক্তি ভোক্তা ও হলিউডের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। হোয়াইট হাউজও বিষয়টিতে মন্তব্য করেছে। সিএনবিসির রিপোর্ট অনুযায়ী মার্কিন প্রশাসন এ পরিকল্পনাকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখছে।
মার্কিন ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন বলেন, ‘এ পদক্ষেপের কারণে বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দর্শকের বিকল্পও সীমিত করে দেবে। শুধু তাই নয়, তারা বিশাল মিডিয়া জায়ান্ট হয়ে উঠবে। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে স্ট্রিমিং বাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ, যা আমেরিকানদের বেশি সাবস্ক্রিপশন খরচ, কম বিকল্প এবং তারা কী দেখবে ও কীভাবে দেখবে, তার ওপর নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ মনোপলি বাস্টার্স ককাস বড় করপোরেশনের অতিরিক্ত ক্ষমতার বিরুদ্ধে কাজ করে এবং প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে আইনগত পদক্ষেপ চায়। এর সহসভাপতি ও মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য প্রমিলা জয়পাল এক্সে পোস্ট করে বলেন, ‘এর মানে হবে আরো দাম বাড়া ও আরো বিজ্ঞাপন। কিন্তু একই ধরনের কনটেন্ট। এর মাধ্যমে শিল্পীদের কম সৃজনশীল স্বাধীনতা ও কর্মীদের মজুরি কমানোর সুযোগ তৈরি করবে। এখানে সরকারকে অবশ্যই হস্তক্ষেপ করতে হবে।’
মার্কিন শেয়ারবাজারেও দুই কোম্পানি একীভূত হওয়ার চুক্তির তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। গত শুক্রবার দুপুরে ওয়াল স্ট্রিটে নেটফ্লিক্সের শেয়ার শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে গেছে এবং ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির শেয়ার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যায়।










