সাধারণভাবে মনে হয়, ভক্তরা সম্মান করে তাকে থালাপতি বলে সম্বোধন করেন। কথাটা ভুল নয়, তবে বিজয়ের এ খেতাব অনেকটা জেনেবুঝেই তৈরি করা হয়েছিল। তামিলে থালাপতির অর্থ ‘নেতা’। বিজয় তার ক্যারিয়ারের একটা পর্যায় থেকে এমন সব গল্প বেছে নিয়েছেন, যেখানে তার চরিত্রগুলো ছিল নেতৃত্বের গুণে ভরা। সম্প্রতি তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নিজ দল নিয়ে জয় পেয়েছেন। বিষয়টাকে সবাই চমক, অপ্রত্যাশিত বলে মনে করছেন। তবে বিজয় মূলত দীর্ঘদিন ধরে সিনেমার মাধ্যমেই নিজের প্রচারণা করে গেছেন। অভিনেতা থেকে জননেতা হওয়ার কৌশলটা তিনি পর্দায়ই খাটিয়ে নিয়েছেন।
জোসেফ বিজয়ের বর্তমান বয়স ৫১ বছর। ১৯৭৪ সালের ২২ জুন চেন্নাইয়ে তার জন্ম। চলচ্চিত্র নির্মাতা এসএ চন্দ্রশেখর ও প্লেব্যাক শিল্পী শোবা চন্দ্রশেখরের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলায়ই চলচ্চিত্র জগতে তার প্রবেশ ঘটে। আশির দশকে বাবার পরিচালিত ‘ভেট্রি’সহ কয়েকটি সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। ১৯৯২ সালে ‘নালাইয়া থেরপু’তে প্রথম নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। তবে সিনেমাটি তেমন সফলতা পায়নি। কয়েক বছরের মধ্যেই ‘পুভ উনাক্কাগা’র (১৯৯৬) মাধ্যমে তিনি সম্ভাবনাময় রোমান্টিক নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। শুরুতেই সাফল্য পাননি। তবে সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছেন। পেছনে ছিল পরিচালক বাবার দেয়া শক্ত পাটাতন।
নব্বইয়ের দশক মোটামুটি পার করেছেন। দর্শকের প্রিয় হয়ে উঠেছেন। নব্বইয়ের শেষভাগ ও ২০০০-এর শুরুর দিকে ‘লাভ টুডে’, ‘থুল্লাধা মানামুম থুল্লুম’, ‘কুশি’ ও ‘ঘিল্লি’ সিনেমা তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রোমান্স, ড্রামা কিংবা অ্যাকশন সব ধরনের চরিত্রে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেন। এ সময় ‘ইলায়া থালাপতি’ (তরুণ নেতা) হিসেবে পরিচিতি পান। তবে এ পরিচিতি সচেতনভাবে তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি সিনেমার শুরুতে তার নাম খেতাবসহ দেখানো হতো। রাসিগা থেকে থেরির আগ পর্যন্ত তিনি ইলায়া থালাপতি ছিলেন। ২০১৭ আসে ‘মার্সাল’। এ সিনেমার পোস্টারে ইলায়া বাদ দিয়ে কেবল ‘থালাপতি’ লেখা হয় এবং বিজয়ের ভক্তরা বিষয়টি আড়ম্বরের সঙ্গে উদযাপন করেন। মূলত বিজয়ের জনপ্রিয়তার পারদ মাথায় রেখে এবং ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজন অনুসারেই কাজটা করা হয়েছিল।
গত এক দশকে সিনেমার মাধ্যমেই তিনি নিজেকে নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ‘থুপ্পাক্কি’, ‘থেরি’, ‘কাথ্থি’, ‘মার্সাল’, ‘মাস্টার’, ‘বিস্ট’ ও ‘লিও’র মতো একাধিক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন বিজয়। তবে এর মধ্যেই ছিল নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার সব উপাদান। থুপ্পাক্কিতে তিনি দেশপ্রেমী সেনাসদস্য, থেরিতে ব্যাডঅ্যাস, কিন্তু নীতিবান পুলিশ। এর মধ্যে কাথ্থি রীতিমতো রাজনৈতিক সিনেমা। অন্য সিনেমাগুলোয়ও সে বার্তা আছে। সর্বশেষ চলচ্চিত্রের নামই ‘জননায়ক’। সিনেমাটি তিনি নির্বাচনের আগে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। যদিও সেন্সর জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক দল গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশের ঘোষণা দেন বিজয়। দলের নাম ‘তামিলাগা ভেট্রি কায়াগাম (টিভিকে)’। অর্থ তামিলনাড়ু বিজয় পার্টি। ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনই এ দলের প্রথম বড় পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় দারুণ চমক দেখান। ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর জননায়কের অডিও উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি অভিনয় থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। এভাবেই ৩৩ বছরের এক উজ্জ্বল চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শেষে রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু করেন বিজয়। নতুন দল হলেও শুরু থেকেই তা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি কঠিন কথা বলেন না। সরল বক্তব্য তাকে মানুষের সঙ্গে সহজে যুক্ত করেছে। পাশাপাশি সিনেমার মাধ্যমে তৈরি করা জনপ্রিয়তা ও ইমেজ এক্ষেত্রে আরো বেশি কাজে দিয়েছে।
নির্বাচনে জিতেছেন বিজয়। কিন্তু এ সাফল্য কেবলই প্রথম ধাপ। এ জয় তাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সিনেমায় নায়ক হয়ে ওঠা কঠিন, তবে সিনেমার নায়ক চাইলেই সিনেমার গল্পে নেতা হয়ে পর্দায় উপস্থিত হতে পারেন। বাস্তবে নেতা হয়ে রাজনীতিতে নেমে তিনি কতটা সফল হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।










