বুকে খুলনা লেখা টিশার্ট। ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্স থেকে দেলুপি দেখে বের হলে প্রশ্ন জাগে—দেলুপি কেমন লাগল? সিনেমা যদি সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়, তবে দেলুপি অনেক বছরের ভেতরে আমার দেখা সবচেয়ে অনেস্ট ফিল্ম। দেলুপি নিয়ে প্রশ্ন এলে এ প্রতিক্রিয়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে। বিপরীতে প্রশ্ন আসতে পারে দেলুপিতে ১০-এর মধ্যে কত নম্বর দেয়া যায়? বস্তুত দেলুপি এমন এক সিনেমা, যেটাকে এসব রেটিংয়ের প্রচলিত ধারায় ফেলাটা অন্যায্য হবে। দর্শক সিনেমাটা দেখবে, চরিত্রগুলোর সঙ্গে হাসবে, কাঁদবে, একাত্মতা অনুভব করবে এবং নিজের জীবন ও সমাজের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়ার অনুপ্রেরণা নিয়ে সিনেমা হল থেকে বের হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের কাহিনী থেকে দেলুপি। পরিচালক দারুণ বুদ্ধিদীপ্তভাবে নাম পরিবর্তন করে দেলুটি বা দেলুপির গল্প তথ্যচিত্রের মতো সাজিয়েছেন! আবার সেখানে আছে নাটকীয়তাও। প্রেম, শত্রুতা, গান, নাচ বাণিজ্যিক সিনেমার উপাদানও বাদ পড়েনি। তবে মুখ্য হয়ে উঠেছে দেশের বর্তমান বাস্তবতা। যা যা ঘটছে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রেখে দুর্যোগকবলিত এক গ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে আখ্যান এগিয়ে নিয়েছেন পরিচালক।
কোনো এক ৭ তারিখের কথা সিনেমায় ঘুরেফিরে আসে। সেদিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গে আরো অনেকের মতো তপন চেয়ারম্যানও পালিয়ে যায়। অনেক বছর ধরে পালিয়ে থাকা জাকির চেয়ারম্যান এলাকায় ফিরে সবকিছু হাতের মুঠোয় আনার কাজ জোরেশোরে শুরু করে। মিহির ও পলাশের মতো কিছু যুবক তাদের বন্যাকবলিত এলাকার প্রধান সমস্যা বেড়িবাঁধ নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করে তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও। যাত্রা হবে না কাওয়ালি— এ নিয়ে শঙ্কায় থাকে গ্রামের যাত্রাদল। এসব কিছুর সঙ্গে থাকে নূপুর ও পার্থর প্রেম!
দেলুপির প্রধান সম্পদ এর সরলতা, সেটা চরিত্রায়ণে যেমন, তেমনি অভিনয় ও কথনেও। এ কারণেই তথাকথিত ‘স্টার’ বা ‘অভিনেতা’দের বদলে বিভিন্ন দুর্যোগ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, ওই বন্যাকবলিত পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষই এ সিনেমায় আছেন ক্যামেরার সামনে ও কিছু ক্ষেত্রে পেছনেও। সে কারণেই সংগীতে আমরা দেখি পলাশ কুমার মল্লিককে। তিনি পেশায় একজন মোটরসাইকেল চালক এবং প্রয়াত নায়ক মান্নার মিমিক্রি করে তার নিজের এলাকায় পরিচিত।
২.
প্রবলভাবে রাজধানীকেন্দ্রিকতায় আক্রান্ত এ দেশে দেলুপি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা আলাপকে সামনে নিয়ে এসেছে। তা হলো দেলুপিকে কি আঞ্চলিক সিনেমা বলা যাবে? সিনেমাজুড়ে দক্ষিণের দেলুটি ইউনিয়নের সেটিং। ভাষাও ওই অঞ্চলের এবং বলতেই হবে যে ভাষার অথেন্টিসিটির ক্ষেত্রে যেমন, কস্টিউম, সাউন্ড ডিজাইনসহ সব বিভাগেই ওই অঞ্চলকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে মুনশিয়ানা দেখতে দেখতে অবচেতনভাবেই অন্যান্য সমসাময়িক বাংলা সিনেমার সঙ্গে তুলনা চলে আসবে আপনার মাথায়। তথাকথিত মেইনস্ট্রিম ও লোকাল সিনেমার তকমা নিয়ে নতুন করে ভেবে এ প্রশ্ন আসতেই পারে যে ‘কেন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক সিনেমাকেই মেইনস্ট্রিম বলতে হবে? কবে আমাদের এ ভয়ংকর হ্রস্বদৃষ্টি কিছুটা হলেও প্রসারিত হবে?’
পরিচালক তাওকীর ইসলাম। তিনি মূলত রাজশাহীর বাসিন্দা এবং দিল্লিতে সিনেমা নিয়ে লেখাপড়া শেষে রাজশাহীতেই ফুটপ্রিন্ট ফিল্ম প্রডাকশন কোম্পানি তৈরি করেন। শাটিকাপ ও সিনপাটের মতো একই সঙ্গে জনপ্রিয় ও সমালোচকদের পিঠ চাপড়ানি পাওয়া ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করেছেন। এবার এসেছেন তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে। শাটিকাপ ও সিনপাট রাজশাহীর পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি, যেমন খুলনার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি ওয়েব সিরিজ ‘ফেউ’ সাম্প্রতিক সময়ে চরকিতে মুক্তি পাওয়ার পর বেশ আলোড়ন তুলেছিল। বাংলাদেশী সিনেমার বিকেন্দ্রীকরণের ব্যাপারটাকে গোলটেবিল বৈঠকের বাইরে নিয়ে এসে এসব পরিচালক সত্যিকারের কাজটা করছেন। এ ধরনের আরো কত ‘ফিল্ম হাব’ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দাঁড়িয়ে গেলে বাংলাদেশের সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে একটা গুণগত পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়বে।
দেলুপির কাজ শুরু হয়েছিল গত বছর। এ বছর সিনেমাটির প্রথম প্রিমিয়ার হয় দেলুটিতেই। খুলনায় মুক্তি পায় ৭ নভেম্বর। তারপর দেশজুড়ে ১৪ নভেম্বর মুক্তি পেয়ে এখন চলছে দেশের নির্বাচিত কিছু সিনেমা হলে। পরে হয়তো বিদেশে যাবে কিছু ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। কিন্তু দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে সিনেমাটা পৌঁছানো প্রয়োজন। বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্র নিয়ে মানুষের যে সাধারণ ধারণা তা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে এটা।
৩.
প্রচারের জন্য বিপুল বাজেট থাকে না সব সিনেমার। সে কারণে কিছু সিনেমা প্রাথমিকভাবে দর্শক আকর্ষণ করতে পারে না। মানুষের মুখে মুখে সে সিনেমার কথা শুনে (ওয়ার্ড অব মাউথ) আরো মানুষ সিনেমাটি দেখতে যায় এবং এভাবে একসময় আরো কিছু উপাদানসমেত সেটি ক্ল্যাসিকে পরিণত হয়। দেলুপি সে পথেই হাঁটছে বলে বোধ হচ্ছে। তবে দেলুপি যে সময় ও সমাজ বাস্তবতার আয়না, বহু বছর পরও বর্তমান সময় বাস্তবতা খুঁজে বের করার জন্য দেলুপির দ্বারস্থ হওয়া যাবে।










