প্রতিদিন সাইবার স্পেসে হয়রানির শিকার হন নারীরা। এর বাইরে পথেঘাটে হয়রানি তো আছেই। নারী নির্যাতন ও হয়রানির প্রতিবাদে প্রত্যেক বছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী পালিত হয় সিক্সটিন ডেজ অব অ্যাকটিভিজম। বাংলাদেশে এবার এই মুভমেন্টে একাত্ম হয়েছেন শিল্প অঙ্গনের বহু ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে আছে নানা আয়োজন।

১৯৯১ সালে রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর উইমেন্স গ্লোবাল লিডারশিপের উদ্যোগে চালু হয় ‘সিক্সটিন ডেজ অব অ্যাকটিভিজম অ্যাগেইনস্ট জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স’। এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার সমস্ত রূপ—শারীরিক, যৌন, মানসিক, অর্থনৈতিক এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো, বিশেষত ডিজিটাল সহিংসতাকে চ্যালেঞ্জ করা।

14

২০২৫ সালে বাংলাদেশে এই ক্যাম্পেইন মিডিয়া শিল্পে এবং অনলাইন হেনস্তা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। গত ২৫ নভেম্বর ঢাকার ‘বাংলাদেশ চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টার’-এ ‘জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাবিরোধী ১৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি’র উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে ডিজিটাল সহিংসতা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল বসানো হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সুশীল সমাজ ও প্রযুক্তি খাতের অংশীদাররা। আলোচনার মূল বিষয় ছিল অনলাইন হেনস্তা, সাইবার বুলিং, লিঙ্গভিত্তিক ভুয়ো তথ্য, ডিপফেক এবং অনুমতি ছাড়া ছবি ও কনটেন্ট শেয়ারিং।

বাংলাদেশের মিডিয়া ও বিনোদন জগতের তারকারা বিশেষভাবে এ আন্দোলনকে সামনে নিয়ে এসেছেন। সম্প্রতি অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা ঘাড়ে ইংরেজিতে ‘৯’ লিখে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করেছেন। বলেছেন, ‘সংখ্যা থেকে কণ্ঠস্বর—চলুন আমাদের গল্পকে বিশ্ববাসীর সামনে আনি। তোমার নাম্বারের গল্প বল, আরো জোর আওয়াজ তোলো।’

15

রুনা খান নিজের কনুইয়ে ‘২৪’ লিখেছেন, যা তাকে নিয়ে প্রতিদিন হওয়া হেনস্তা-মন্তব্যের সংখ্যা বোঝায়। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, অনলাইন হেনস্তা শুধু সেলিব্রিটিদের নয়, যেকোনো নারী সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করলে এটির সম্মুখীন হতে পারে। মডেল ও অভিনেত্রী পিয়া জান্নাতুল ‘ইনফিনিটি’ প্রতীক এঁকে ছবি পোস্ট করেছেন যা অগণিত হেনস্তা প্রকাশ করে। অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া হাতের তালুতে লিখেছেন ১ হাজার, যা তার দৈনন্দিন হেনস্তার সংখ্যা প্রকাশ করে। এদের পাশাপাশি মৌসুমি হামিদ, প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, আশনা হাবিব ভাবনা এবং আরো অনেক তারকাই এ আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ায় কণ্ঠস্বর তুলেছেন। তারা মূলত ‘সিক্সটিনডেজঅবঅ্যাক্টিভিজম’ ও ‘মাইনাম্বারমাইস্টোরি’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছেন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মাত্র ৪০ শতাংশের কম দেশই নারীদের সাইবার হেনস্তা বা সাইবারস্টকিং থেকে সুরক্ষা দেয়ার আইন রাখে। এর ফলে বিশ্বে ৪৪ শতাংশ নারী ও কন্যাশিশু (১৮০ কোটি) আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ক্যাম্পেইন মিডিয়া ও সেলিব্রিটিদের নেতৃত্বে অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে বিপ্লব শুরু করেছে।

ক্যাম্পেইনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘মাইনাম্বারমাইস্টোরি’ আন্দোলন, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা হাত, মুখ বা ঘাড়ে একটি সংখ্যা লেখেন যা তাদের দৈনন্দিন হেনস্তার পরিমাণ বোঝায়। এই সরল কিন্তু শক্তিশালী প্রতীক দর্শক ও সমাজকে দেখায় যে অনলাইন সহিংসতা শুধু কয়েকজনের সমস্যা নয়, এটি বিস্তৃত, ব্যাপক ও যৌক্তিক।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ এ বছরের ১৬ দিনের ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে পালাকার নাট্যদলের ‘স্টোরিজ অব কারেজ’ ও ‘ইকোজ অব হার লাইফ’ নামে থিয়েট্রিক্যাল প্রেজেন্টেশন পরিবেশনের মাধ্যমে নারীদের পাবলিক স্পেস, পরিবহন ও সার্ভিস প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাহীনতার বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।