কোরিয়ান নাটক বা কে-ড্রামা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। এ জনপ্রিয়তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনের জাদুকরী শক্তিটা হলো রোমান্টিক ও কমেডি গল্প এবং জীবনঘনিষ্ঠ নাটকীয় প্লট। এগুলো এতই উপভোগ্য যে যেন এক পর্ব শেষ হলে দর্শকের আরেক পর্বের তর সয় না। রোমান্টিক-কমেডি সিরিজগুলোয় সবসময় চমকপ্রদ কিছু থাকে। ফলে দর্শক সহজেই পর্দা থেকে চোখ সরাতে পারে না!

দর্শকের আবেগকে দারুণভাবে স্পর্শ করা কোরিয়ান ড্রামার প্রসঙ্গ তুললে ‘রিপ্লাই ১৯৮৮’ সিরিজের নামই সবার আগে আলোচনায় আসে। এটি ২০১৫ সালে প্রথম প্রচার হয়। এক দশক পরও বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মনে আজও উষ্ণতা ছড়ায়। ১৯৮০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়ায় বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। সিউলের স্যাং মুন-দং নামের এক শান্ত পাড়ার পাঁচ বন্ধুর বড় হয়ে ওঠার গল্পকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সেখানে ৮০-৯০ দশকের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়। আছে পারিবারিক ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, প্রথম প্রেম, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং জীবনের অতি সাধারণ অথচ গভীর সব মুহূর্ত। ২০১৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি শুক্রবার ও শনিবার টিভিএন চ্যানেলে ২০টি পর্বে প্রচারিত হয় এই ড্রামা। ড্রামাটি শুধু স্মৃতিময় বাস্তবতাই তুলে ধরেনি, বরং আধুনিক কে-ড্রামার ইতিহাসেও নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।

সিরিজটির লেখক লি উ-জুং, পরিচালক শিন উন-হো। সিরিজে লি হাইরি, রিউ জুন-ইওল, গো কিয়ং-পিও, পার্ক বো-গাম এবং লি ডং-হুই অসাধারণ অভিনয় করেন যা দর্শকদের নিজের আশপাশের পরিচিত মুখ বলে মনে হয়।

সিরিজটি প্রচারের সময় দক্ষিণ কোরিয়ার অ্যান্টেনা ও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমের চ্যানেলগুলোর আধিপত্য ভেঙে কেবল টিভিতে আনে নতুন যুগ। ফাইনাল পর্বে রেটিংয়ে এটি কোরিয়ার ইতিহাসে সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ড্রামা হিসেবে রেকর্ড গড়ে। কোরিয়ার তরুণ প্রজন্মকে অতীতের স্বাদকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। গল্পে ৮০-৯০ দশকের জনপ্রিয় স্টাইল, গেম, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির উপাদানগুলো ব্যবহার করা হয় যা দর্শকদের নস্টালজিক করে তোলে। ফলে দেশজুড়ে রেট্রো ফ্যাশন (পুরনো ফ্যাশনকে আধুনিকভাবে ফিরে আনা) ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ দেখা যায়।

এর সাফল্য দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে যায় দ্রুতই। ২০১৬ সালে চীনে প্রচারের পর মাত্র এক মাসে এটি ২৩৫ মিলিয়ন ভিউয়ার হয়। পরে নেটফ্লিক্সে যুক্ত হলে বিশ্বব্যাপী ভিউয়ারশিপ আরো বাড়তে থাকে, বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময়ে। স্ট্রিমিং জায়ান্ট নেটফ্লিক্সের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সিরিজটি এখনো প্রতি বছরই মিলিয়ন মিলিয়ন ঘণ্টা দেখা হয়, যা একটি অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার প্রতীক বলা যায়। এ বিষয়ে লেখক লি উ-জুং বিবিসিকে বলেন, ‘সিরিজটি লেখার সময় আমার বৈশ্বিক লক্ষ্য ছিল না। আমি শুধু আশা ছিল, এটি কোরিয়ানদের ভালো লাগবে। কিন্তু যখন দেখলাম এটি বিশ্বব্যাপী দর্শকদের কাছেও সাড়া ফেলেছে, তখন বুঝতে পারলাম—বিশ্বের সব মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও গল্প শেষ পর্যন্ত অনেকটা একই রকম।’

বর্তমানে আধুনিক স্ট্রিমিং সংস্কৃতি দ্রুতগতিতে ভবিষ্যতের দিকে মোড় নেয়া নাটকী গল্প চায়, সেখানে ‘রিপ্লাই ১৯৮৮’ ঠিক বিপরীত পথে হাঁটে। দীর্ঘ, ধীর, অনুভবময় গল্প বলার ধরনই এটিকে আলাদা করে তোলে। ড্রামাটির শক্তি এর বাস্তবতা—একটি পাড়ার ভেতর পরিবারগুলো কীভাবে একে অন্যের ওপর নির্ভর করে, ভালোবাসে, হাসে, ঝগড়া করে—সবকিছুই এক অদ্ভুত কোমলতায় দেখানো হয়েছে।

দশ বছর পরও সিরিজটি মনে করিয়ে দেয়, পরিবার, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক—এসব অনুভূতি পৃথিবীর সর্বত্র একই। আমরা যত আধুনিকই হই না কেন, শেষ পর্যন্ত আমাদের গল্পগুলো গভীরভাবে মানবিকই থাকে।