এর মূলে আছে একটি প্রশ্ন—জাসলাভ কি ওয়ার্নার ব্রাদার্সকে বাঁচিয়েছেন, না ক্ষতি করেছেন? বিতর্কটি আরো তীব্র হয়েছে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে প্যারামাউন্ট স্কাইডান্সের কাছে বিক্রির বিষয়ে। ১১০ বিলিয়ন ডলারে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ চুক্তির মাধ্যমে ওয়ার্নার ব্রাদার্স, এইচবিও, এইচবিও ম্যাক্স, সিএনএন ও অন্যান্য কেবল নেটওয়ার্ক একত্রিত হবে। ফেব্রুয়ারিতে হওয়া এ চুক্তি বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনাধীন রয়েছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের অপেক্ষায়। পাশাপাশি হলিউডের সৃজনশীল মহলের বিরোধিতার মুখেও পড়েছে। এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জাসলাভের পারিশ্রমিক।

ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির নেতৃত্বে চার বছর ছিলেন জাসলাভ। এরপর তিনি এ বিক্রি থেকে অন্তত ৫৫ কোটি ডলার পাবেন। পাশাপাশি থাকবে আরো ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ভেস্টেড স্টক। সমালোচকরা এ বিপুল অর্থপ্রাপ্তি একটি গভীর বৈষম্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। কেননা এর একদিকে থাকছে শীর্ষ নির্বাহীর বিপুল প্রাপ্তি, অন্যদিকে একীভূতকরণের ফলে সম্ভাব্য ব্যাপক চাকরিচ্যুতি। অনেকের চোখে জাসলাভ এখন হলিউডের এক নতুন বাস্তবতার প্রতীক, যেখানে একত্রীকরণ ও আর্থিক কৌশল কিছু মানুষের লাভ বাড়ায়, কিন্তু কর্মসংস্থানকে অনিশ্চিত করে তোলে।

ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি বিক্রি মূলত ওয়ার্নার ব্রাদার্স ও এইচবিওর কর্মীদের জন্য আট বছরে তৃতীয় বড় করপোরেট পরিবর্তন। ২০১৮ সালে কোম্পানিটি এটিঅ্যান্ডটির কাছে বিক্রি হয়। ২০২২ সালে ডিসকভারি ইনকরপোরেটেডের সঙ্গে একীভূত হয়ে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি গঠিত হয়। এখন আবার প্যারামাউন্ট স্কাইডান্সের অধীনে যাওয়ার পথে। প্রতিটি চুক্তিই বিপুল ঋণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, যা কোম্পানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করেছে। বর্তমান চুক্তি সম্পন্ন হলে নতুন সত্তার ওপর প্রায় ৭ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের ঋণ থাকবে।

জাসলাভকে নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করছেন। তাকে কেউ বলছেন ‘শবদেহ সাজানো কর্মচারী’। কেননা তিনি কোম্পানিকে বিক্রিযোগ্য করে তুলেছেন এবং বিপুল অর্থ নিয়ে নিজে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এ মন্তব্যগুলো ইঙ্গিত করে যে চুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদি সৃজনশীল স্থিতিশীলতার চেয়ে স্বল্পমেয়াদি শেয়ারহোল্ডার লাভকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

তবে বেশকিছু সূত্র বলছে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোম্পানির নেতৃত্বে থাকতে চেয়েছিলেন। বিপুল অর্থপ্রাপ্তি সত্ত্বেও, তিনি কোম্পানি পরিচালনা এবং তার সৃজনশীল দিকনির্দেশনা নিয়েই বেশি আগ্রহী ছিলেন। তার ঘনিষ্ঠদের মতে, তিনি কয়েক বছর ধরে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে পুনর্গঠন করে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ডেভিড এলিসনের আগ্রাসী অধিগ্রহণ উদ্যোগের কারণে প্রতিষ্ঠান বিক্রি প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়ে।

বিনিয়োগকারী ডেভিড গিফেন এ দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করেন। তার মতে, জাসলাভের প্রধান লক্ষ্য ছিল নেতৃত্ব দেয়া, ব্যক্তিগত লাভ নয়। গেফেন নিজেও এ চুক্তি থেকে ৭০ কোটি ডলারের বেশি লাভ করবেন। তিনি ওয়ার্নার ব্রাদার্স পিকচার্সের সাম্প্রতিক সাফল্য এবং শক্তিশালী পুরস্কার মৌসুমকে কোম্পানির সৃজনশীল পুনরুত্থানের প্রমাণ হিসেবে দেখান এবং জাসলাভের নেতৃত্বে নতুন দক্ষ টিম গঠনের প্রশংসা করেন।

আর্থিক দিক থেকেও জাসলাভের সময়ে প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ২০২২ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি গঠনের সময় কোম্পানির প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ ছিল। জাসলাভের চেষ্টায় ২৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। একই সময়ে এইচবিও ম্যাক্স ২১০ কোটি ডলারের ক্ষতি থেকে ২০২৫ সালে ১৪০ কোটি ডলারের লাভে পরিণত হয়। এ উন্নতিগুলোই নেটফ্লিক্স ও কমকাস্টের মতো বড় কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করে তোলে।

ওয়ার্নার ব্রাদার্স গঠনের পর থেকেই বারবার বিক্রি হয়েছে। এবারের বিক্রি আরো বড় প্রশ্ন তোলে—প্রচলিত চলচ্চিত্র ও টিভি ব্যবসার ভবিষ্যৎ কতটা টেকসই? যদি ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও স্বাধীনভাবে টিকে থাকতে না পারে, তবে অন্যদের ভবিষ্যৎ কী? বিশ্লেষক দৌ ক্রুতজের মতে, গত দশকে যারা মিডিয়া কোম্পানি বিক্রি করেছে তারা বেশি লাভবান হয়েছে, ক্রেতারা নয়।

জাসলাভ শুরু থেকেই জানতেন যে ওয়ার্নার ব্রদার্স ডিসকভারি হয়তো একসময় বিক্রি হবে। তবে তার পরিকল্পনা ছিল প্রথমে কোম্পানিটিকে পুনর্গঠন করা, বিশেষ করে কেবল নেটওয়ার্কগুলো আলাদা করে মূল চলচ্চিত্র ও স্ট্রিমিং ব্যবসাকে শক্তিশালী করা। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগোতে শুরু করে। কিন্তু প্যারামাউন্ট স্কাইডান্সের আগ্রহ এ পরিকল্পনাকে থামিয়ে দেয়। বোর্ডের আইনি দায়িত্ব ছিল সর্বোচ্চ মূল্যের প্রস্তাব বিবেচনা করা, যা নেটফ্লিক্স ও কমকাস্টের প্রতিযোগিতামূলক বিড পরিস্থিতিকে আরো তীব্র করে তোলে। অবশেষে প্যারামাউন্ট স্কাইডান্সের ৩১ ডলার প্রতি শেয়ারের প্রস্তাব চুক্তিকে চূড়ান্ত করে। এ পরিস্থিতি দেখায় যে জাসলাভের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ছিল। তিনি রুপার্ট মারডক বা শেরি রেডস্টোনের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক শেয়ারহোল্ডার নন।

জাসলাভের সমালোচনার অভাব না থাকলেও তার মধ্য দিয়ে হলিউডের একটি পুরনো দ্বন্দ্বই নতুন করে সামনে এসেছে। সৃজনশীল ধারাবাহিকতা বনাম আর্থিক বাস্তবতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বনাম তাৎক্ষণিক লাভ। এর মধ্যে জাসলাভ নায়ক না বিক্রেতা হিসেবে স্মরণীয় হবেন, তা নির্ভর করবে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ভবিষ্যতের ওপর।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান