বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাক—অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করে তিনি জয় করেছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান, তবু যেন তিনি হারিয়ে যাননি।

তার প্রতিভা, দীর্ঘ অভিনয়জীবন আর মানবিক গুণাবলি আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে নতুন প্রজন্মের কাছে। রাজ্জাক কেবল পর্দার অভিনেতা নন, তিনি ছিলেন মানুষের নায়ক—যার সংলাপ, গান ও চরিত্র আজও দর্শকের মনে অমলিন। এ অভিনেতা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে তার সিনেমা জীবনের যাত্রা হতো ছয় দশকেরও বেশি সময়জুড়ে।

নায়করাজ হিসেবে রাজ্জাকের পথচলার সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে, ১৯৬৬ সালের ২৮ অক্টোবর। সেদিন মুক্তি পায় জহির রায়হান পরিচালিত বিখ্যাত সিনেমা ‘বেহুলা’, যেখানে সূচন্দার বিপরীতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো বড় পর্দায় নায়ক চরিত্রে হাজির হন রাজ্জাক। সেদিনই শুরু হয় এক কিংবদন্তির জন্ম, যার আলো পরবর্তী কয়েক দশকজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা বাংলা চলচ্চিত্রজগতে।

১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন রাজ্জাক। ছোটবেলা থেকেই মঞ্চনাটকে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই একসময় তিনি চলে আসেন ঢাকায়, শুরু করেন কঠিন সংগ্রামের জীবন। বহু কষ্টের পর অবশেষে পান সুযোগ—জহির রায়হানের বেহুলা সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিনয়ের। সে একটি সিনেমাই বদলে দেয় তার জীবন, গড়ে তোলে এক অনন্য সাফল্যের ইতিহাস।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রাজ্জাককে। একে একে তিনি অভিনয় করেন তিন শতাধিক সিনেমায়। তার অভিনীত প্রতিটি সিনেমায়ই ছিল প্রাণ, ছিল চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা। ‘আলোর মিছিল’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘দুই ভাই’, ‘বাঁশরি’, ‘স্বরলিপি’, ‘মনের মতো বউ’, ‘ময়নামতি’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘ঢাকা ৮৬’, ‘আমি বাঁচতে চাই’সহ অগণিত সিনেমায় তিনি ছিলেন দর্শকদের প্রিয় মুখ। উপহার দিয়েছেন একের পর এক কালজয়ী চরিত্র।

অভিনয়ের পাশাপাশি রাজ্জাক ছিলেন সফল পরিচালক ও প্রযোজক। তিনি ২০টিরও বেশি সিনেমা পরিচালনা করেছেন এবং ‘রাজলক্ষ্মী প্রডাকশনস’ নামে নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে থেকে তৈরি হয়েছে বেশকিছু জনপ্রিয় সিনেমা, যা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে দর্শকের কাছে।

চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নায়করাজ রাজ্জাক ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট, এ মহান অভিনেতা চিরবিদায় নেন। তবে তার রেখে যাওয়া স্মৃতি, অভিনয় ও অবদান আজও বেঁচে আছে কোটি দর্শকের হৃদয়ে।

নায়করাজের ছোট ছেলে সম্রাট বলেন, ‘দেখতে দেখতে আব্বার অভিনয়জীবনের পথচলার ৬০ বছরে পদার্পণ হয়ে গেল। আব্বা আজ বেঁচে থাকলে হয়তো অনেক কিছুই হতো। আব্বা নেই বলে বিষয়টি নিয়ে বিশেষত চলচ্চিত্র পরিবারের কোনো আগ্রহ বা উচ্ছ্বাস নেই। তার পরও আব্বার ভক্ত-দর্শকেরা আব্বাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন, তারা নায়করাজ রাজ্জাককে যে ভালোবাসেন, এটাই আমাদের পরম পাওয়া। আব্বার জন্য সবাই দোয়া করেন, যেন আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করেন, এটাই শেষ চাওয়া।’