বরাবরই শক্তিশালী, সংবেদনশীল ও বাস্তবধর্মী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি বিশেষভাবে খ্যাত। রোড, মুভি, পার্চড, ডেখ ইন্ডিয়া, ইয়েলো বাস থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট সবখানেই তার কাজ প্রশংসিত হয়েছে। ২০১৯ সালে ‘রোম রোমে ম্যাঁ’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। অভিনয়, গান ও লেখালেখির পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক গল্প বলাই তার শিল্প ও অভিনয়চর্চার মূল চালিকাশক্তি। সে যাত্রাপথেই ক্যান্সারের মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও থেমে যাননি তন্নিষ্ঠা, বরং অভিনয়কেই বানিয়েছেন লড়াইয়ের হাতিয়ার।
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসার মাঝেই একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ও একটি মঞ্চনাটক সম্পন্ন করেছেন অভিনেত্রী তন্নিষ্ঠা চট্টোপাধ্যায়। কেমোথেরাপির যন্ত্রণা, শারীরিক ভাঙন ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও তার পরিচালিত সিনেমা ‘ফুল প্লেট’ সম্পন্ন করেন। সিনেমাটি গত বছরের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পায়। পাশাপাশি শারিব হাশমির সঙ্গে তৈরি মিউজিক্যাল মঞ্চনাটক ‘ব্রেস্ট অব লাক’-এ সফলভাবে অভিনয় করেন। নাটকটি মোম্বাইয়ের ওয়্যারহাউজে গত ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি দুটি প্রদর্শনী হয়, যা দর্শক ও চিকিৎসকদের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

২০২৪ সালের শেষ দিকে অনন্ত মহাদেবনের পাস্ট টেন্স সিনেমার শুটিং চলাকালীন শারিব হাশমির সঙ্গে একটি নাটক করার পরিকল্পনা করেন তন্নিষ্ঠা। ঠিক তখনই তার ক্যান্সার ধরা পড়ে। তন্নিষ্ঠা তখন নিজের অসুস্থ মায়ের দেখভালও করছিলেন। এমন অবস্থায় নাটকের ভাবনা বাদ দেয়ার কথাই প্রথমে মাথায় এসেছিল। তবে অভিনয় জগতের প্রতি তীব্র প্রেম তাকে থামতে দেয়নি। তিনি বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, আমি কী করছি, নাটক? কিন্তু মনে হলো বাড়ি ফিরে গেলে আমি ভেঙে পড়ব। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, এ অভিজ্ঞতাকে নিয়েই কিছু করব।’
বন্ধুদের সমর্থন ছিল তন্নিষ্ঠার বড় শক্তি। বিশেষ করে শারিব হাশমির স্ত্রী, যিনি নিজেও ক্যান্সারের সঙ্গে একাধিকবার লড়াই করেছেন, তার সঙ্গে কথোপকথন তন্নিষ্ঠাকে সাহস জুগিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আমি শারিবকে বললাম, ‘এ বিষয়েই আমরা নাটক করব। সে ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ব্রেস্ট অব লাক। এটি হালকা, রসিকতাময়, কিন্তু গভীর মানবিক নাটক। নাটকে তন্নিষ্ঠা অভিনয় করেছেন গায়িকা শীলা চরিত্রে, যার ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তার সম্পর্ক, শরীর ও মানসিক অবস্থায় পরিবর্তন আসে। শারিব হাশমির চরিত্রের নাম অরুণ, সে শীলার পাশে দাঁড়ায় হাসি, গান আর সঙ্গ দিয়ে।’
নাটকে তন্নিষ্ঠার বাস্তব কেমোথেরাপির ফুটেজও ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে তাকে গান গাইতে ও রসিকতা করতে দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইনজেকশনগুলো খুব যন্ত্রণাদায়ক ছিল। সেটি মানিয়ে নিতে আমি গান গাইতাম বা নিজেকে নিয়ে মজা করতাম। ওটাই ছিল আমার মোকাবেলার উপায়।’
একই সময় তিনি শেষ করেন ‘ফুল প্লেট’ সিনেমা। এটি পরিচালনা করেছেন লীনা যাদব। সিনেমায় এক গৃহকর্মী নারীর নীরব আত্মঅন্বেষণ ও ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। তন্নিষ্ঠার কথায়, ‘সব লড়াই বিপ্লবী হয় না। কিছু লড়াই খুব চুপচাপ হয়, একটা ছোট পদক্ষেপ দিয়েই সেটি হতে পারে।’
চিকিৎসার সময় মানসিকভাবে টিকে থাকার জন্য তন্নিষ্ঠা নিজেকে দূরে রেখেছেন সামাজিক মাধ্যম ও ওটিটি প্লাটফর্ম থেকে। তিনি বলেন, ‘আমি বই পড়েছি, গান আর যোগব্যায়াম করেছি, পার্কে গিয়ে কিছু না করে বসে থেকেছি। শিল্প, হাসি আর মানুষের পাশে থাকা এ তিনই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’
ক্যান্সারের মতো কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখেও তন্নিষ্ঠা চট্টোপাধ্যায়ের এ সৃষ্টিশীল যাত্রা শুধু অনুপ্রেরণাদায়ক নয়, সমসাময়িক বিনোদন জগতের জন্যও এক সাহসী মানবিক দৃষ্টান্ত।
স্ক্রল ডটইন অবলম্বনে বাশার খান










