প্রতি সপ্তাহে হলিউড কিংবা স্থানীয় মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তি পাচ্ছে কোনো না কোনো নতুন হরর সিনেমা। কখনো পুরনো সিরিজ নতুন করে নির্মিত হচ্ছে, (যেমন আই নো হোয়াট ইউ ডিড লাস্ট সামার), কখনো সিকুয়াল (ফাইনাল ডেস্টিনেশন: ব্লাডলাইনস), আবার কখনো ক্ল্যাসিক কাহিনীর নতুন প্রেক্ষাপট (দ্য ফার্স্ট উইমেন, এ কোয়াইট প্লেস: যে ওয়ান)। এমনকি এখন ভ্যাম্পায়ার বা শয়তানও ফিরে আসছে নতুন করে। যেমন গিয়েরমো দেল তোরোর ফ্র্যাংকেনস্টাইন বা লুক বেসনের ড্রাকুলা: এ লাভ টেল। কিন্তু প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই সিনেমাগুলো জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ব্যবসাসফল হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, কেন ধারাটি বারবার ফিরে আসে। নতুন রূপ নেয়, আর দর্শকও কেন প্রতিবারই হলে ছুটে যায়? উত্তরটা সহজ নয়। কিন্তু একটি কথা স্পষ্ট—ভয় বিক্রি হয়, আর হরর জনরা জানে কীভাবে বিক্রি করতে হয়।
হরর সিনেমা শুধু ভয় দেখানোর গল্প নয়। এটি সমাজের ভেতরের অন্ধকার দিকের প্রতিফলন। মৃত্যুভয়, মানসিক বিকার, ধর্মীয় উগ্রতা বা প্রযুক্তির দখল—সবই এ ঘরানার ক্যানভাসে ধরা পড়ে। আধুনিক হরর নির্মাতারা যেমন জর্ডান পিল (গেট আউট), অ্যারি অ্যাস্টার (হেরেডিটারি) কিংবা জেনিফার কেন্ট (দ্য বাবাডক) ভয়কে ব্যবহার করছেন এক ধরনের সামাজিক ভাষা হিসেবে। তাদের সিনেমা প্রশ্ন তোলে বর্ণবাদ, পুরুষতন্ত্র, মানসিক স্বাস্থ্য কিংবা মাতৃত্ব নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, মেগান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপদ নিয়ে তৈরি। হিজ হাউজ অভিবাসনের যন্ত্রণার গল্প বলে, আর দি ইনভিজিবল ম্যান উন্মোচন করে বিষাক্ত পুরুষতন্ত্রের মুখোশ।
যখন রোমান্টিক কমেডি বা সুপারহিরো সিনেমাগুলো বাজারনির্ভর হয়ে ঝুঁকি এড়িয়ে চলে, তখন হররই একমাত্র ঘরানা, যা সমাজের প্রকৃত ভয় বা অবচেতনের আতঙ্ক প্রকাশের সাহস করে। এর আছে প্রাসঙ্গিকতা ও বদলে যাওয়ার ইতিহাস।
১৯৭০-এর দশকে হরর প্রথম বড় ধরনের রূপান্তর ঘটায়। জর্জ রোমেরো, জন কার্পেন্টার, ওয়েস ক্রেভেনরা ভয়কে এনে ফেলেন আমেরিকার গ্রাম ও শহরতলির বাস্তবতায়। দ্য টেক্সাস টেইস শ ম্যাসাকার বা হ্যালোইনের মতো সিনেমা তখন কেবল রক্তাক্ত থ্রিলার নয়—ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি আর সামাজিক হতাশার প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে এ ধারায় এক ধরনের ক্লান্তি চলে আসে। নব্বইয়ের দশকে তা হরর পরিণত হয় আত্মপরিহাসে। স্ক্র্যারি মুভি বা দ্য হান্টিংয়ের মতো প্যারোডিতে হারিয়ে যায় সে গভীরতা। নতুন শতকে নতুন করে ফেরে হরর।
১৯৯৯ সালে আসে দ্য ব্লেয়ার উইচ প্রজেক্ট। এটি প্রমাণ করে অতি কম বাজেটেও ‘ফাউন্ড ফুটেজ’ স্টাইলে ভয় দেখানো সম্ভব। একই বছর দ্য সিক্সথ সেন্স চমকপ্রদ মোড় ও আবেগময় কাহিনী দিয়ে হররকে নতুন মর্যাদা দেয়। আর জাপানের রিং প্রযুক্তিনির্ভর আতঙ্ককে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে পরিণত করে। সিনেমায় দেখানো একটি অভিশপ্ত ভিডিওটেপ থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন যুগ।
এ সময়েই ইউরোপ ও এশিয়ার হরর সিনেমা পশ্চিমে জনপ্রিয় হতে থাকে। ফ্রান্সের ‘নিউ ফ্রেঞ্চ এক্সট্রিমিটি’ ধারার মার্টায়ারস বা ইরিভার্সেবল চরম সহিংসতার নতুন সংজ্ঞা দেয়। ধারাটি পরে ‘টর্চার-পর্ন’ নামে আলোচিত হয়। স্বল্পস্থায়ী জলেও এ ধারায় টেরিফায়ার থ্রির মতো সিনেমা প্রমাণ করে এ জনরার দর্শক আছে।
ভয় আর দর্শনের মিশেল নিয়ে আসে এলিভেটেড হরর। ২০১৫ সালে দ্য উইচ মুক্তির পর শুরু হয় হররের এ নতুন যুগ। গেট আউট ও হেরেডিটরি এ ধারাকে পোক্ত করে। এখানে ভয় কেবল বিনোদন নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের উপকরণ।
জর্ডান পিল তার নোপে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ও হররকে একসঙ্গে মিশিয়েছেন। এদিকে অ্যারি অ্যাস্টার মিডসোমারে শোক, একাকিত্ব আর মানসিক ভাঙনকে এক নৃশংস সৌন্দর্যে রূপ দিয়েছেন। আর জেনিফার কেন্টের দ্য নাইটিঙ্গেল উপনিবেশবাদী সহিংসতার ওপর দাঁড়িয়ে এক ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডি।
এ নতুন নির্মাতারা ভয় দেখানোর প্রচলিত কৌশল—লাফিয়ে ওঠা বা চিৎকারে ভড়কে দেয়া—এড়িয়ে যাচ্ছেন। তারা ব্যবহার করছেন রঙের প্রতীক, নীরবতা এবং অস্পষ্ট কাহিনী, যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে। এ সবকিছুর মধ্য দিয়ে বাজারে চলছে হরের জয়যাত্রা।
বড় বাজেটের স্টুডিও যেখানে ঝুঁকি নিতে ভয় পায়, সেখানে হরর এখন সবচেয়ে লাভজনক ঘরানা। ব্লামহাউজ (গেট আউট, প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি) ও এ টোয়েন্টিফোরের (হেরেডিটারি, টক টু মি) মতো সংস্থাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে অল্প বাজেটে শিল্প এবং বাণিজ্য একসঙ্গে সম্ভব।
একইভাবে লংলেগস বা দ্য মাংকির মতো সিনেমা নতুন ধরনের ডিজিটাল প্রচারণা ব্যবহার করে দর্শক টানছে। যেমন একসময় দ্য ব্লেয়ার উইচ প্রজেক্ট করেছিল। এখন কান ও সানড্যান্স উৎসবেও হরর সিনেমা মূল প্রতিযোগিতায় জায়গা পাচ্ছে, যা এক যুগ আগেও অকল্পনীয় ছিল।
শেষ পর্যন্ত হররের সাফল্যের রহস্য একটাই—এটি বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায় না। বাস্তব জীবনে যখন খবর খুললেই চোখে পড়ে দুর্নীতি, যুদ্ধ, ভাঙন বা মৃত্যু, তখন সিনেমার পর্দায় এ ভয়কে দেখা মানে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা।
হরর আমাদের জন্য এক নিরাপদ থেরাপি। যেখানে ভয় আছে, কিন্তু তার সীমানাও আছে; মৃত্যু আছে, কিন্তু ফিল্ম শেষ হলে আলো জ্বলে ওঠে। সম্ভবত এ কারণেই হরর আজকের যুগের সবচেয়ে সৎ ঘরানা। এ পৃথিবী যত ভয়ংকরই হোক, হরর সিনেমা আমাদের শেখায়—ভয়কে চিনে নাও, মুখোমুখি হও, তারপর হাসো। কারণ ভয়ও এক ধরনের মুক্তি।
অ্যান বিলসনের নিবন্ধ অনুসরণে মাহমুদুর রহমান










