ব্যক্তিগত সংকট ও অসুস্থতার কঠিন সময় তাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। কিংবদন্তি সুরকার আলাউদ্দিন আলীর উত্তরাধিকার বহন করলেও তিনি খুঁজছেন নিজের স্বতন্ত্র সংগীতভাষা। তার নতুন অ্যালবাম নিয়ে তৈরি হয়েছে শ্রোতাদের আগ্রহ। সংগীতচর্চা, অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান
সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে আপনার চতুর্থ অ্যালবাম। দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে এসে নিজের শিল্পীসত্তাকে কীভাবে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন?
আসলে দীর্ঘ বিরতি বলব না, কারণ আমি সবসময়ই সংগীতের সঙ্গে ছিলাম, আছি। তবে মাঝখানে কভিড, ব্যক্তিগত সমস্যা ও অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করা হয়নি। আমার শেষ সিঙ্গেল অ্যালবাম ২০২০ সালে বের হয়। এরপর ডায়ালাইসিস, ট্রান্সপ্ল্যান্ট-এ সময়ে আমি গান তৈরি করতে পারিনি। গান লেখা ও সুর করার জায়গাটা ভীষণ মিস করছিলাম। গত বছর থেকে আবার কাজ শুরু করেছি, পুরনো কিছু গান রিওয়ার্ক করেছি, নতুন গানও করেছি। পুরো প্রক্রিয়াটা আমি ভীষণ উপভোগ করেছি এবং নিজের শিল্পীসত্তাকে নতুনভাবে খুঁজে পেয়েছি।
আপনার নতুন অ্যালবামের গানগুলো নিয়ে যদি একটু বিস্তারিত জানাতেন...
আমার নতুন অ্যালবামে মোট ছয়টি গান আছে। এর মধ্যে চারটি মৌলিক ও দুটি রিমেক। দুটি গান আমি নিজে লিখেছি, বাকি দুটি আমার স্বামী কাজী ফয়সাল আহমেদের লেখা। তিনটি গানের সুর করেছে ফয়সাল, একটি গান আমি নিজে সুর করেছি। সব গানেই মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছে ফয়সাল।
আপনার ব্যক্তিগত জীবনে শারীরিকভাবে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করে এখন সুস্থ। অসুস্থতা আপনার সৃষ্টিশীলতায় কি কোনো ধরনের পরিবর্তন এনেছে?
অসুস্থতার সময়টা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল। তখন আমি অনেক সাধারণ বিষয়ও করতে পারতাম না। যেমন প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবে গোসল করা বা ইচ্ছেমতো বাইরে যাওয়া। সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালাইসিস করতে হতো। এ অভিজ্ঞতা আমাকে জীবনের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে। এখন যখন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারি, সেটাই বড় আনন্দ। এ উপলব্ধি আমার সংগীত চিন্তায় গভীরতা এনেছে, আমি এখন সংগীত নিয়ে আরো গভীরভাবে ভাবছি।
আপনার বাবার সংগীতধারা এবং আপনার নিজের স্টাইল—এ দুইয়ের মধ্যে কী পার্থক্য দেখতে পান?
আমার বাবার সংগীতধারা আর আমার স্টাইল একেবারেই আলাদা। আলাউদ্দিন আলী নিজেই একটা বিশাল অধ্যায়। সবসময় একজন আলাউদ্দিন আলী আসেন না। আমি কখনো তার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করি না। আমি আমার মতো করে গান করি, যেটা আমার কণ্ঠ, টোনালিটি ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই। জোর করে এমন কিছু করি না, যা আমার সঙ্গে যায় না।
পুরনো জনপ্রিয় গান রিমেক করার সময় কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়?
রিমেক করা সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। ‘দেখো তো আমায়’ তুলনামূলক সহজ ছিল, কারণ এটি রকধর্মী গান। কিন্তু ‘কাগজ আছে কলম আছে’ ছিল ফোক-ডিসকো ধাঁচের, যা অ্যারেঞ্জ করা খুব কঠিন। আগের সময় লাইভ ইনস্ট্রুমেন্টে যেভাবে করা হতো, এখন সে সেটআপ পাওয়া কঠিন। তাই শেষ পর্যন্ত আমরা অরিজিনাল কপি না করে নিজেদের মতো করে নতুন রেন্ডিশন করেছি।
নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের রুচি অনুযায়ী গান তৈরি করতে গিয়ে কি কখনো নিজের মৌলিকতা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন?
না, আমি কখনো ভাইরাল বা জনপ্রিয় হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গান করি না। চাইলে নিয়মিত অনেক গান রিলিজ করতে পারতাম। কিন্তু আমার লক্ষ্য সবসময়ই ছিল আমি যা ভালোবাসি, সেটাই করা। পাঁচজন মানুষও যদি সেটা পছন্দ করে, তাতেই আমি খুশি।
বর্তমান সংগীত ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার জন্য শিল্পীদের কোন দিকগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে মনে করেন?
আমি ‘টিকে থাকা’ এ চিন্তায় গান করি না। তবে এখনকার সময়ে শুধু গান করলেই হয় না, মার্কেটিং বুঝতে হয়। গান কোথায় রিলিজ হবে, কোন প্লাটফর্মে যাবে, কীভাবে ডিস্ট্রিবিউশন হবে, এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া খুব জরুরি। এখন শিল্পীদের স্মার্ট সিদ্ধান্ত নিতে জানতে হবে।
ডিজিটাল প্লাটফর্মের যুগে অ্যালবাম সংস্কৃতি ধরে রাখার পেছনে আপনার ব্যক্তিগত দর্শন কী?
আমার অ্যালবাম ভালো লাগে। কারণ একটা অ্যালবাম একজন শিল্পীর সময়ের পরিচয় বহন করে। ২০০৬ বা ২০১১ সালের অ্যালবাম শুনলে আমি বুঝতে পারি, তখন আমার সংগীত ভাবনা কেমন ছিল। তাই আমার কাছে অ্যালবাম মানে একটি মিউজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট।
ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রের জন্য গান করার পরিকল্পনা আছে কি?
চলচ্চিত্রে গান করার জন্য আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে কেউ যদি মনে করে, আমি কোনো গানের জন্য উপযুক্ত এবং আমন্ত্রণ জানায় আর গানটি আমার সঙ্গে মানানসই হয়, তাহলে অবশ্যই করব।
ভবিষ্যতে কোনো বিশেষ ধরনের এক্সপেরিমেন্টাল বা ফিউশন সংগীত নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে কি?
এক্সপেরিমেন্ট করার ইচ্ছা অবশ্যই আছে। যদি সুস্থ থাকতে পারি এবং এ ধারা ধরে রাখতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের গান নিয়ে কাজ করতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন আমি ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারি।










