অর্থাৎ পুরো পৃথিবীই সুরের আধার। প্রকৃতি এখানে বাদ্যযন্ত্র ও বাদক উভয় হিসেবেই কাজ করে। কান পাতলেই প্রকৃতির নিজস্ব সুর শোনা যায়। বাতাসের শোঁ শোঁ বয়ে যাওয়ার শব্দ কিংবা জলের কুহক। তবে সুর কোনো একক সৃষ্টি নয়। যেখানে সুর আছে, সেখানে সহজাতভাবেই থাকে তাল, লয়, ভাব-ভঙ্গিমা। এসব নৃত্যেরও অংশ ‘নিত্য জাগে সরস সংগীতমধুরিমা, নিত্য নৃত্যরসভঙ্গিমা।’ যেমন ভাব, রাগ, তালের মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছিল শাস্ত্রীয় নৃত্যের এক অনন্য রূপ, ভরতনাট্যম। প্রতিটি নৃত্যের বিন্যাসে রয়েছে নিজস্ব তাল ও অঙ্গভঙ্গি।

শিল্পের অনুপ্রেরণা প্রকৃতি। তাই কবি যখন উপমা হিসেবে চাঁদকে বিশেষণ হিসেবে নেন, নৃত্যশিল্পী সে চাঁদকে দেখায় অসংযুক্ত হস্তমুদ্রায়। এভাবেই পৃথিবীর বিভিন্ন শিল্পের মতো নৃত্যের বিকাশ ঘটে প্রকৃতি থেকে মানুষের চর্চায়। আবহমানকাল থেকে নৃত্যের পৃষ্ঠপোষক, শিল্পীরা নৃত্যকে এগিয়ে নিয়েছেন বর্তমান পর্যন্ত।

3

একবার ঢাকায় ছায়ানটে কত্থক নৃত্য সম্প্রদায়ের ‘কত্থক নৃত্য উৎসব ১৪২৩’-এ এসেছিলেন পণ্ডিত বিরজু মহারাজ। সে উৎসবে তিনি বলেছিলেন, ‘দেখুন সারা দুনিয়াই নাচছে! এই দেখুন না, বাতাস নাচছে, চাঁদ নাচছে, পৃথিবী নাচছে, পাতা নাচে, ফুল নাচে। কৃষ্ণ বাঁশি বাজায়, শিব ডমরু বাজায়, নাচে তো বটেই। নৃত্য হলো জীবনের প্রতিস্থাপন। নাচ হলো কবিতার মতো। কবিতার মতো নাচ জীবনবোধের সৃষ্টি করে। সে বোধ কেউ পায়, কেউ হয়তো পায় না।’ এ কথার প্রমাণও আদিকাল থেকেই পাওয়া যায়।

নৃত্য সম্পর্কে সবার বোধ একরকম নয়। সময়ের বিবর্তনে এ শিল্পের গায়ে নানা কলঙ্কও জুড়েছে। একসময় নৃত্য কেবল ছিল প্রার্থনার অংশ। এর স্থান ছিল মন্দিরে। প্রার্থনা সংগীতের সঙ্গে এর বিকাশ ঘটে। কালক্রমে তা বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। নৃত্যের ইতিহাসে দেখা যায়, কীভাবে নৃত্য মন্দির থেকে জলসাঘরে প্রবেশ করে। জলসাঘরে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে নৃত্যের প্রতি একধরনের নেতিবাচক মনোভাব সমাজে গড়ে ওঠে। যারা নৃত্য করেন তাদের, বিশেষ করে নারীদের চরিত্র ঘিরে নানা ট্যাবু গড়ে ওঠে। এমনকি একসময় নৃত্যকে জেন্ডার রোলের মতো নারীদের কাজ বলে অভিহিত করার চর্চা শুরু হয়। পুরুষ নৃত্যশিল্পীকে মেয়েলি হিসেবে মশকরা করার প্রবণতা তৈরি হয়। যদিও এ ধরনের কোনো ‘তকমা’ দিয়েই শিল্পের বিকাশ আটকে রাখা কেবল কঠিন নয়, অসম্ভবও বটে। যুগে যুগে তাই নৃত্যের বিকাশ ঘটেই চলেছে।

ভারতবর্ষের আটটি শাস্ত্রীয় নৃত্য ভরতনাট্যম, কত্থক, মণিপুরি, মোহিনী অট্টম, কথাকলি, ওড়িশি, কুচিপুডি, সত্রীয়ার পাশাপাশি পুরো বিশ্বে নৃত্যের বিভিন্ন ঘরানা রয়েছে। সেখানে আধুনিক হিপহপ, সালসা, বেলিড্যান্স, রোবোটিক থেকে শুরু করে ফ্রি স্টাইল, ফিউশন সব ঘরানার নৃত্যই রয়েছে। আবার অনেক শিল্পী নৃত্যকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে তাদের নামানুসারেই নৃত্যের নতুন রূপ তৈরি হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মাইকেল জ্যাকসন। তার নাচের ভঙ্গি পরিচিত এমজে (মাইকেল জ্যাকসন) ড্যান্স ফর্ম হিসেবে। তার সবচেয়ে স্বতন্ত্র ড্যান্স মুভ (নৃত্যবিন্যাস) হলো ‘মুন ওয়াক’। আবার বলিউড সিনেমায় নৃত্য পরিচালনাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে ‘বলিউড ড্যান্স ফর্ম’ বলেই নৃত্যের একটা রূপ গড়ে উঠেছে। এভাবে যুগের পর যুগ নৃত্য সব বাধা-নিষেধ পেরিয়ে শিল্প হিসেবে সমহিমায় টিকে আছে এবং থাকবে।

বিশ্ব নৃত্য দিবসের শুভেচ্ছা সবাইকে।