সন্ধ্যা গড়িয়ে ঘনিয়ে আসে রাত। ভিড় বাড়ে সুনামগঞ্জ শহরের পুরনো বাসস্টেশন এলাকার বাস কাউন্টারগুলোয়। যাত্রী বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত। সবার চোখে-মুখেই বিষণ্নতার চাপ। কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞেস করতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বছর পঁয়তাল্লিশের মিরাজ মিয়া। জানান, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। সংসারে আছেন বৃদ্ধ বাবা-মা। আর তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। বৈশাখে অন্যের জমির ধান কেটে ছয় মাসের আয়-রুজি করেন। নিজেদেরও কিছু জমি আছে। বর্ষায় মাছ ধরে বিক্রির পর যা পান তা দিয়ে চাল-ডালসহ খরচাপাতি জোগান। এভাবে ভালোই কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু এবারের প্রথম দফা বন্যায় সব ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এরপর দুই দফা বন্যায় একেবারে নিঃস্ব হয়ে যান হাওরবেষ্টিত ধর্মপাশা উপজেলার বেড়িকান্দা গ্রামের মিরাজ। থাকার ঘরটিও ভেঙে পড়ায় মা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে নিয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় যাচ্ছেন।
পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি এবং বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের প্রায় সব হাওরে অথই পানিতে সেখানকার অসহায় মানুষের মাঝে এখন শুধুই হাহাকার। ধানের পর মাছও নষ্ট হয়েছে। আয়-রোজগারের কোনো পথ না থাকায় হাওরাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ বসতভিটা ফেলেই ঢাকামুখী হচ্ছেন পরিবার নিয়ে। রোববার মিরাজ মিয়া বলেন, কামকাজ নাই। থাকনের জায়গাসহ যা আছিল সব বন্যায় লইয়া গেছে। ওহন না খাইয়া মরত ওইবো। ছেলেমেয়ে, মা-বাবা ও স্ত্রী আছে। হেরারে তো চখের সামনে মরতে দেওন যায় না। সবাইরে লইয়া তাই ঢাহার হিদ্ধিরঞ্জ (ঢাকার সিদ্ধিরগঞ্জ) যাইতাছি। দেহি কাজকাম ফাওন যায়নি। বাপেরে বাইত রাইক্কা আইছি। কিছুই তো করার নাই। গরিব ওইলে দেহনের কেউ তাহে না রে বাই (ভাই)।
মিরাজের পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়নের দরেরপাড় গ্রামের কণিকা বিশ্বাস। জানালেন, মেয়ের জন্মের বছরখানেক পর থেকেই স্বামী প্রভাস বিশ্বাস নিখোঁজ। দুই বছর জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন। কিন্তু বানের জলে সব ভেসে যাওয়ায় এবার আর বাঁচার উপায় নাই। নিচু এলাকায় বাড়ি, তাই দীর্ঘদিন পানি থাকায় জিনিসপত্রসহ মাথাগোঁজার ঘরটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কণিকা বললেন, ঢাকার টঙ্গী যাব। সেখানে ভাইয়ের পরিচিত একজন আছেন। গেলে কোনো একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিবেন বলেছেন।
শুধু মিরাজ আর কণিকা নয়; তাহিরপুরের বাঁধাঘাট এলাকার ইসলামপুরের মো. জামাল উদ্দিন, ছাতকের ইসলামপুর ইউনিয়নের বৈশাকান্দি গ্রামের আব্দুল হেকিম ও আব্দুন নূরসহ বিভিন্ন উপজেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা দরিদ্র মানুষ বসতভিটা ফেলে শহরমুখী হচ্ছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় সুনামগঞ্জের ৪৫ হাজার ২৮৮ পরিবারের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একেবারে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ৭৪৭টি পরিবারের ঘরবাড়ি।
স্থানীয় হাওর বাঁচাও আন্দোলন, হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটি (হাউস), পরিবেশ
ও হাওর উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন এনজিওর তথ্যমতে, সুনামগঞ্জে ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯৫ লোকের বাস। অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ। এরই মধ্যে জেলার ১৫-২০ ভাগ লোকের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঢাকামুখী হয়েছে। হাউসের নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বলেন, হাওরাঞ্চলের মানুষ বন্যায় অর্থ সংকটে পড়ায় ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ি মেরামত করতে পারছেন না। আর কাজকর্ম না থাকায় খাবার জোগানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে অজানা গন্তব্যে রওনা দিচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষগুলো। এনা পরিবহনের সুনামগঞ্জ বাস কাউন্টারের ম্যানেজার সাজু মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, সবসময়ই ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ থাকে। তবে আমাদের চেয়ে লোকাল গাড়িগুলোর যাত্রী বেশি। সবাই নিম্নবিত্ত।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সবার তালিকা আমরা করেছি। নগদ অর্থসহ সহায়তা পৌঁছে দিয়েছি। তবে কাজের সন্ধানে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় যেতেই পারে, এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।










