বালি মাটিতে তলদেশ ভরে গিয়েছে ভারতের মেঘালয় থেকে আসা সীমান্ত নদী খাসিয়ামারার। কয়েক বছর ধরে পাহাড়ি ঢলে আসা বালিমাটিতে নদী ভরে যাওয়ায় বছরে আট মাস থাকে হাঁটু পানি। চলে না নৌকা। স্থানীয়দের হেঁটে নদী পার হতে হয়। এটি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ও সুরমা ইউনিয়ন দিয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে শেষ হয়েছে।
নদীর মধ্যবর্তী স্থানে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত অপরিকল্পিত রাবার ড্যাম স্থাপন হওয়ার পর থেকে ভারত থেকে আসা বালিমাটিতে নদীর তলদেশে আকটা পড়ে নদী ভরে যাওয়ায় সীমান্ত এলাকায় দেখা দিয়েছে পানির সংকট। এতে করে ওই এলাকায় দুই হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি রয়েছে। ফলে ফমলি জমি আবাদ করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন এ অঞ্চলের লাখো কৃষক। নদী খনন না করলে পানির সংকটে দিন দিন বাড়বে অনাবাদি জমির পরিমাণ। তাই দ্রুত নদী খননের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক। তবে সংশ্লিষ্টরা জানালেন, সমীক্ষা করে নেয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, উপজেলায় পানির সংকটে দুই হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি রয়েছে।
জানা গিয়েছে, দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা, লক্ষ্মীপুর ও বোগলাবাজার তিনটি ইউনিয়নের আট হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদের জন্য ২০০০ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগের অর্থায়নে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে খাসিয়ামারা নদীতে রাবার ড্যাম স্থাপিত হয়েছে। স্থাপনের কয়েক বছর ভালো গেলেও ধীরে ধীরে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা বালিমাটি ভরাট হয়ে খাসিয়ামারা নদীটি নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে খাসিয়ামারা নদীতে বছরের অধিকাংশ সময় হাঁটুপানি থাকে। রয়েছে চাষীদের জন্য পানির সংকটও। এ কারণে কৃষক ধান চাষ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। তাই এসব ফসলি জমিতে চাষাবাদ বাড়াতে দ্রুত নদী খননের দাবি জানিয়েছেন কৃষক।
এদিকে প্রতি বছর বন্যায় আর পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা বালির আগ্রাসনে ভরাট হতে থাকে দোয়রাবাজার উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের টিলাগাঁও, মহব্বতপুর টেংরা, বক্তারপুর, খাগুরা গ্রিসনগরসহ শতাধিক গ্রামের কয়েক হাজার একর ফসলি জমি। বর্ষা মৌসুমে পানিতে বাড়িঘর, রাস্তা-ঘাটে ভাঙন, ফসলি জমি, বীজ তলা, ধান, সবজি, মত্স্য খামার, স্কুল-কলেজ ও একটি বাজারসহ অসংখ্য স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় মিরপুর গ্রামের হানিফ আলী বলেন, আমরা ছোটবেলায় খাসিয়ামারা নদীতে নৌকা চলতে দেখেছি। এ নদীতে সাঁতার কেটেছি, কিন্তু এখন নদী মরে গিয়েছে। মূলত ভারতের বালিমাটিতে ভরাট হয়েছে এ নদী। বালিমাটি রাবার ড্যামের কারণে সরাসরি সুরমায় নামতে না পারায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমরা হেঁটে নদী পার হই। অথচ আগে এ নদী পার হতে নৌকা লাগত।
নোয়াপাড়া গ্রামের সেলিম আহমদ বলেন, রাবার ড্যামের কারণে খাসিয়ামারা নদীর তলদেশে বালি মাটিতে ভরে গিয়েছে। বছরের অধিকাংশ সময় নদীতে হাঁটুপানি থাকে। নদীতে পানি না থাকায় এলাকায় ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানির সংকটে আমরা চাষাবাদ করতে পারছি না।
সুরমা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম জানান, আমরা ছোটবেলায় খাসিয়ামারা নদী দেখেছি অনেক গভীর। এ নদী দিয়ে ট্রলার, বাল্কহেডসহ বড় বড় নৌ-যান চলাচল করত, কিন্তু এখন এ নদীতে বারকি নৌকাও চলাচল করতে পারে না। অপরিকল্পিত রাবার ড্যাম স্থাপনের পর থেকে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে ভারতীয় বালিমাটিতে খাসিয়ামারা নদী ভরাট হয়ে গিয়েছে। এতে করে রাবার ড্যাম গলার কাঁটা হয়ে খাসিয়ামারা নদী মরে যাচ্ছে। এরই মধ্যে এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর পর নদী শুধু নামেই থাকবে।
তিনি আরো জানান, আগে আমি জমিতে ধান চাষ বেশি করতাম, কিন্তু পানির অভাবে ফসল না হওয়ায় এখন ধান চাষ কমিয়ে সবজিসহ বিভিন্ন ফসল করছি। সবজিতে সেচ দিতে পানি পাওয়া যায় না। অনেক কষ্ট করে সবজি চাষ করছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানান, দোয়ারাবাজার উপজেলার খাসিয়ামারা নদীর তীরবর্তী এলাকা উঁচু হওয়ায় দুই হাজার হেক্টরের বেশি জমি পানির অভাবে অনাবাদি রয়েছে। বালিমাটিতে নদী ভরাট হওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা কমে গিয়েছে। কয়েক বছর ধরে ওইসব এলাকার কৃষক সেচ পাম্পের মাধ্যমে পানি দিয়ে জমি চাষাবাদ করছেন। আমরা চেষ্টা করছি, সেচ পাম্প বৃদ্ধি করে অনাবাদি জমিগুলোকে চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসা যায় কিনা।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর-২) মো. শামছুদ্দোহা বলেন, বর্তমানে সুনামগঞ্জে নদ-নদী ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে। জেলার বেশির ভাগ নদ-নদী ও সীমান্ত নদীর সমীক্ষা চলছে। এ সমীক্ষা অনুযায়ী যেসব নদীর ডিপিপি প্রণয়ন করা হবে, সেসব নদী খনন করা হবে। তবে জেলার যাদুকাটা নদীর মতো খাসিয়ামারা নদীতে জোয়ার এলেই সীমান্তের বালিতে ভরে যায়। এটি খনন করে রাখা যাবে না। প্রতি বছর খনন করতে হবে। এ নদীতে একটি রাবার ড্যাম আছে। এ রাবার ড্যামের কারণে নদীর তলদেশ ভরে গিয়েছে।
সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, খাসিয়ামারা নদীতে নির্মিত রাবার ড্যামটি আমাদের। এ নদীতে আমাদের রাবার ড্যামের মাধ্যমে সেচ দিয়ে ওই এলাকার কৃষক ধান চাষ করেন, কিন্তু খাসিয়ামারা নদী ভরাট হওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা কমে গিয়েছে। তার পরও আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করব।










