মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রথম ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয় কালিঘাট চা বাগানে। এটি দেশের চা শিল্পাঞ্চলের প্রথম ডাকঘর হিসেবে পরিচিত। চিঠিপত্রের প্রচলন আগের মতো না থাকলেও এখনো সেবা দিয়ে যাচ্ছে শত বছর পার করা ডাকঘরটি। ১৯২২ সালের আগে ডাকঘরটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সে হিসাবে গত বছর শতবর্ষ পূর্ণ করেছে ডাকঘরটি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৯২২ সালের আগে চা বাগানে আর কোনো ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা, এমন তথ্য কারো জানা নেই। সে সময় এ অঞ্চলের চা বাগানের মালিক ছিল ব্রিটিশ কোম্পানি। চা বাগানে শ্রমিকের কাজ করানোর জন্য ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে তখন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে আসা হয়। সে সময় ডাকঘরটি ছিল চা বাগানে পত্র যোগাযোগের একমাত্র ভরসা। চা বাগানকে কেন্দ্র করেই ডাকঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে এখান থেকে পোস্টকার্ডে লিখে টেলিগ্রাম পাঠানো হতো। বিশেষ করে ইংরেজরাই তাদের পরিবারের সঙ্গে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করত। ডাকঘরের ব্যবস্থাপনায়ও ছিল ব্রিটিশরা। পাশাপাশি ভিনদেশী চা শ্রমিকরাও চিঠির মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
পোস্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, ডাকঘরটির প্রথম পোস্ট মাস্টার ছিলেন একজন বিহারি। তবে ১৯৬০ সালে মজুমদার নামে একজন বাঙালি পোস্ট মাস্টার নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এ অঞ্চলে মানুষের বসতি বেড়ে যাওয়ায় ডাকঘরের কার্যক্রমও বেড়ে যায়। বর্তমানে কালিঘাট চা বাগান ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের ১০ হাজার মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে এ ডাকঘর।
ডাকঘরটিতে শত বছরের স্মারক হিসেবে অনেক মূল্যবান জিনিস এখনো টিকে আছে। এর মধ্যে আছে আগের লাল টিনের বেড়া ও টিনের ছাউনির ঘর। আছে মাটির নিচে একটি লোহার সিন্দুক। যাতে রাখা হয় মূল্যবান জিনিসপত্র। আছে সেই আমলের ছোট বড় দুটো নিক্তি, যার দ্বারা মাপা হয় চিঠিসহ অন্যান্য জিনিসের ওজন। পায়ে হেঁটে চলা রানারের ব্যবহৃত পিতলের ব্যাজ, আসাম সরকারের নামাঙ্কিত কয়েকটি সিলমোহরসহ বিভিন্ন স্মারকও রয়েছে।
কালীঘাট উপডাকঘরের পোস্ট মাস্টার তুষার কান্তি দত্ত পুরকায়স্থ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র কম আসে। তবে চা বাগানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, চিঠি, সরকারি বিভিন্ন চিঠিপত্র নিয়মিত আসে। এখানে পোস্ট মাস্টার, একজন পোস্টম্যান ও একজন রানার রয়েছেন।’
চা বাগানের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, এখানকার কয়েক প্রজন্মের সুখ-দুঃখের সাক্ষী এ কালিঘাট উপডাকঘর। ডাকঘরে আগের মতো ব্যস্ততা নেই, মানুষের আনাগোনা নেই। তবু শত বছরের স্মৃতি হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে লাল টিনের তৈরি ঘরটি। কয়েক প্রজন্ম এ ডাকঘরের সেবা নিয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। এখন সময় পালটেছে। আগে মোবাইল, টেলিফোন, ইন্টারনেট কিছুই হাতের কাছে ছিল না। চিঠিতেই ছিল যোগাযোগ। এখন কেউ চিঠি লিখে না। প্রয়োজনও নেই। তবু চিঠি যুগের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা আঁকড়ে আছে ডাকঘরটি।
পোস্ট মাস্টার আব্দুল মতিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডাকঘরটি শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যের একটি অংশ হয়ে গেছে। এর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য একটি স্মারক ডাক টিকিট তৈরির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাব। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রয়োজন।’










