সুনামগঞ্জে ফসল নিরাপদ রাখার পাশাপাশি আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওর রক্ষাবাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা। হাতে সময় আছে মোটে এক মাস। যদিও ৬১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধের অধিকাংশ স্থানে এখনো কাজই শুরু করা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এমনকি গণশুনানি ছাড়াই প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) তৈরিরও অভিযোগ তোলা হয়েছে।

আগাম বন্যার হাত থেকে সুরক্ষা দিতে এবং কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) নীতিমালা (সংশোধিত)-২০১৭-এর ভিত্তিতে সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার কথা ১৫ ডিসেম্বর। ৬১২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য জেলায় এবার পিআইসি গঠনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭৮০টি। এজন্য অর্থ বরাদ্দের চাহিদা দেয়া হয়েছে ১২৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৬২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত পিআইসি গঠন হয়েছে মাত্র ৩০০টি। ফলে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন বোরো চাষীরা।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের শনির হাওরের কৃষক গোলাম সারোয়ার লিটন বলেন, জেলার সবচেয়ে বড় হাওর শনির হাওর এখনো অরক্ষিত রয়েছে। হাওর রক্ষাবাঁধের জন্য নির্ধারিত সময় প্রায় শেষের দিকে। কিন্তু এখনো শনির হাওরের অনেক বাঁধে এক টুকরি মাটি পড়েনি। ফেব্রুয়ারিতে কোনোভাবেই শনির হাওরের কাজ শেষ করা যাবে না। ফলে প্রথম দফা বন্যায় হাওরের পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড দাবি করছে, ৭৮০টি পিআইসির মধ্যে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন শতাধিক বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই বাকি কাজ শুরু হবে। নির্ধারিত সময়সীমা ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে বলে আশা করা যায়।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও কাবিটা নীতিমালা কমিটির সদস্য সচিব মো. সবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, সুনামগঞ্জে চার দফা বন্যায় হাওরে পানি বেড়ে যায়। হাওর থেকে পানি নামতে দেরি হওয়ায় সময়মতো বাঁধের কাজ শুরু করা যায়নি। এরই মধ্যে ৩০০টির মতো পিআইসির কাজ শুরু হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে বাকি পিআইসিগুলোর কাজ শুরু হবে।

পিআইসি গঠনে অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি কোনো পিআইসি নীতিমালা অনুযায়ী না করা হয় এবং এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী জেলা কমিটির পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬৩৩ কিলোমিটার বাঁধের কাজ করার জন্য ৭৪৫টি পিআইসির গঠন করে অর্থ বরাদ্দের চাহিদা দেয়া হয়েছিল ১৩২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল ১০২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৫১ কিলোমিটার বাঁধের কাজ করার জন্য ৫৭২টি পিআইসির গঠন করা হয়। বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৮০ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশ রক্ষা করতে গিয়ে পিআইসি গঠন প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ করা হয়। যে কারণে সামগ্রিকভাবে হাওর রক্ষাবাঁধের কাজ শুরু করতে দেরি হয়। এতে করে ঝুঁকির মুখে পড়ে হাওরের ফসল। পিআইসি গঠনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই নির্ধারিত সময়ে হাওর রক্ষাবাঁধের কাজ করা যাবে। আগাম বন্যার শঙ্কা মাথায় রেখে দ্রুত সময়ে জেলার শতভাগ হাওরের সব বাঁধের কাজ সম্পন্ন হবে এমনটাই প্রত্যাশা করি।

কৃষকদের অভিযোগ, উপজেলা পর্যায় থেকে হাওরে গিয়ে সুবিধাভোগী, জমির মালিক ও প্রকৃত কৃষকদের নেতৃত্বে পিআইসি গঠনের কথা থাকলেও সেটা করা হচ্ছে না। জেলার শাল্লা, দোয়ারাবাজার, দিরাই, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার হাওরগুলোয় পিআইসি গঠনে অনিয়ম হয়েছে।

ডেকার হাওর পারের বাসিন্দা সেবুল আহমদ বলেন, প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে পিআইসি গঠন করা হয়েছে। এ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে কাজে আসেনি। পরে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।

২০১৭ সালের ফসল রক্ষাবাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনায় কাবিটা নীতিমালায় সংশোধন এনে হাওর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প শুরু করে সরকার। এতে জেলা প্রশাসক জেলা কমিটির সভাপতি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় নির্বাহী প্রকৌশলী সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি রয়েছে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও কাবিটা নীতিমালা কমিটির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, হাওর রক্ষাবাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত কতটুকু কাজ হয়েছে, সেটি বলা যাচ্ছে না। খোঁজখবর নিয়ে জানাতে হবে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে অন্য কেউ যদি পিআইসির সদস্য হয়ে থাকেন, তাহলে আমরা তা বাদ দিয়ে নতুন পিআইসি গঠন করব। এক্ষেত্রে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।