ইলিশসম্পদ উন্নয়নে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পদ্মা ও মেঘনাসহ পাঁচটি অভয়াশ্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। অভয়াশ্রমসংশ্লিষ্ট নদ-নদীতে জাটকাসহ সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো রয়েছে কঠোর অবস্থানে। বিভিন্ন সময় নদ-নদীতে অভিযান পরিচালনা করলেও বন্ধ হয়নি জাটকা শিকার। প্রতিদিন মুন্সিগঞ্জের সড়ক ও নৌপথ ব্যবহার করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে কয়েকশ মণ জাটকা। অবাধে জাটকা শিকারের কারণে চলতি মৌসুমে ইলিশ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মৎস্য কর্মকর্তারা।

সরজমিন দেখা গেছে, টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দিঘীরপাড় পুলিশ ফাঁড়ির পাশেই বসে জাটকা বিক্রির হাট। টঙ্গিবাড়ী উপজেলার হাসাইল মাছঘাটেও অবাধে বিক্রি হচ্ছে জাটকা ইলিশ। এসব ঘাট থেকে জাটকা কিনে স্থানীয় হাটবাজারসহ গ্রামে গ্রামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এসব এলাকার হাটবাজারের চেয়ে বেশি জাটকা প্রতিদিন সড়ক ও নৌপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে। ২২ ফেব্রুয়ারি ভোরে উপজেলার বেশনাল মোড় থেকে ১ হাজার ২০০ কেজি জাটকাসহ একটি পিকআপ জব্দ করলে এ বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন দিঘীরপাড় বাজারে ভোর হলেই বসছে জাটকা বিক্রির হাট। বাজারের ৪২টি আড়তের প্রতিটিতেই কম-বেশি বিক্রি হচ্ছে জাটকা। প্রতিদিন কয়েকশ মণ জাটকা বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ ক্রেতাদের। এছাড়া দিঘীরপাড় বাজারের পাশের রাকিরকান্দি খানকা শরিফের পাশে প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বসে জাটকা বিক্রির হাট। ওই স্থানে জাটকা বিক্রির হাট বসান দিঘীরপাড় এলাকার মাছ ব্যবসায়ী নুরু খাঁ। এছাড়া টঙ্গিবাড়ী উপজেলার হাসাইল মাছঘাটেও অবাধে বিক্রি হচ্ছে জাটকা।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে আরো জানা গেছে, প্রতিদিন মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, চাঁদপুর ও মাদারীপুরের নদ-নদী থেকে জাটকা ধরছেন জেলেরা। পরে সেগুলো সংগ্রহ করছেন ব্যবসায়ীরা। সদর উপজেলার কালিরচর এলাকার বাচ্চু মেম্বারের ছেলে রিপন ও শরীয়তপুর জেলার কাচিকাটার বাদশা খাঁন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের হাত ধরে প্রতিদিন কয়েকশ মণ জাটকা পাচার হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। এছাড়া পদ্মা-মেঘনার মোহনা কালিরচর, কাচিকাটা, নড়িয়া, বকচর, চাঁদপুরের মাদবরবাড়ী এলাকার নদীতে জাটকা ধরছেন শত শত জেলে। ওইসব জেলের কাছ থেকে জাটকা কিনে নিয়ে আসেন রিপন ও বাদশা। পরে জাটকাগুলো মুন্সিগঞ্জের নদী ও সড়ক পথে পাচার করা হচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

এ ব্যাপারে মুন্সিগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এটিএম তৌফিক মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা তো প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু লোকবল কম, তাই অনেক বেশি অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। জেলেদের অবাধে জাটকা শিকারের কারণে চলতি মৌসুমে ব্যাহত হতে পারে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা।’

পুলিশ মৎস্য কর্মকর্তাদের ছাড়া অভিযান পরিচালনা করতে পারে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একজন এসআই চাইলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন।’

এ ব্যাপারে দিঘীরপাড় পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. শাহ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাটকা বিক্রি বন্ধ করা মৎস্য কর্মকর্তার কাজ। তিনি যখন আমার কাছে সাহায্য চেয়েছেন, আমি তাকে সাহায্য করেছি। যখন অভিযান চালানো হয় আমরা সার্বিকভাবে সহায়তা করেছি। এ বছর মৎস্য কর্মকর্তা তিনদিন অভিযান পরিচালনা করেছেন। তিনদিনই আমি তাকে সহযোগিতা করেছি।’

সরজমিন দেখা গেছে, মুন্সিগঞ্জের পদ্মা নদীপাড়ের রাকিরকান্দি, কালীরচর, শান্তিনগর ঘাট, যোগীনিঘাট, চিতলীয়া, দেওয়ানকান্দি ঘাট দিয়ে জাটকাগুলো পাচার করা হচ্ছে। রিপন ও বাদশা খাঁনসহ কয়েকজন পাইকার এসব জাটকা কেনেন। অভিযোগ রয়েছে, রিপন মালয়েশিয়া থাকেন। তিনি শুধু জাটকা বিক্রির মৌসুম শুরু হলে মালয়েশিয়া থেকে আসেন। মৌসুম শেষ হলে তিনি আবার মালয়েশিয়া চলে যান।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে পুরোদমে শুরু হয়ে এপ্রিল পর্যন্ত জাটকা বিক্রি করেন রিপন ও বাদশা খাঁন। মাঝেমধ্যে প্রশাসন কঠোর হলে কখনো অ্যাম্বুলেন্সে আবার কখনো সবজির মাঝে লুকিয়ে জাটকা বিক্রি করেন তারা।

জাটকা ইলিশ বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে রিপন বলেন, ‘আমার পূর্বপুরুষরা এ ব্যবসা করে আসছেন। আমিও করি। তবে খুব বেশি নয়, অল্প পরিমাণ জাটকা বিক্রি করছি।’

বাদশা খাঁনও জাটকা বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘এ বছর ব্যবসায় অনেক লোকসান হয়েছে।’ বেসনাল এলাকায় তার মাছের গাড়ির আটকের বিষয়টিও স্বীকার করে বলেন, ‘শুধু আমার মাছ আটক করেনি, ওই গাড়িতে অন্যান্য ব্যবসায়ীর মাছও ছিল।’