সিলেটে টানা ২১ ঘণ্টা বৃষ্টি হয়েছে। এতে নদ-নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার ওপরে উঠেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভেতরে পানি ঢুকে গেছে। নিচতলার তিনটি ওয়ার্ডে পানি জমে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে রোগী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে গত রোববার সুরমা নদীর পানি সিলেট পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে থাকলেও টানা বৃষ্টির কারণে গতকাল সকালে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত সিলেটে ২৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সিলেট আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজীব হোসাইন জানান, সিলেটে আগামী দুদিন অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের বা ভারি বৃষ্টি হতে পারে। রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৫ ঘণ্টায় ২৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৯ দশমিক ২ ও দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে দুটি নদীর পানি চারটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার দশমিক ৫৮ ও সিলেট পয়েন্টে বিপৎসীমার দশমিক ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারাও সবক’টি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

অন্যদিকে বৃষ্টির পানি সিলেট নগরের ছড়াগুলো দিয়ে নদীতে মিশতে না পারায় নগরের বিভিন্ন স্থান জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। সরজমিনে দেখা যায়, সিলেট নগরীর মিরের ময়দান পায়রা, দরগাহ, মিরাবাজার, তালতলা, মাছুদীঘিরপার, জামতলা, তোপখানা, কাজির বাজার, যতপুর, তেররতন, উপশহর, সোবহানীঘাট, শেখঘাট, লালদীঘিরপারসহ অনেক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ ছিল সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রবেশমুখে। ফটক থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ভবন, কলেজ ফটক, ছাত্রীনিবাস ও ছাত্রাবাসেও পানি উঠে যায়। ফলে সেখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের পাশাপাশি দুর্ভোগে পড়েন চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃষ্টির তোড়ে হাসপাতালের নিচতলায় প্রশাসনিক ব্লকের ২৬, ২৭ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে পানি ঢুকে পড়ে। আগে থেকে প্রস্তুত থাকায় প্রশাসনিক ব্লকের কাগজপত্রের কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে চাপ বেশি থাকায় মেঝেতে অবস্থান করা রোগীরা কিছুটা ভোগান্তিতে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির পেছনে উত্তর পাশ ঘেঁষে প্রবাহিত ছড়ার পানি উপচে ক্যাম্পাস ও হাসপাতালে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হাসপাতালের নিচতলার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজন তাহমিনা বেগম বলেন, ‘গতকাল রাত ১২টার দিকে হাসপাতালের মেঝেতে কাপড় পেতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওই সময় বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। এরপর ভোরের দিকে হাসপাতালে হইহুল্লোড় শুরু হয়। নিচতলার কয়েকটি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি, পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। পরে আমরা অন্য ওয়ার্ডে আশ্রয় নিই।’

নিচতলায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক সৌ‌মিত্র চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘‌হাসপাতালের তিনটি ওয়ার্ডে পানি ঢুকেছে। এতে চিকিৎসাসেবায় ব্যাঘাত ঘটছে। গতকালের পরীক্ষা ও ক্লাস বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষার তারিখ জানানো হবে।’

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের নিচতলা পুরোটাতেই পানি ঢুকেছে। গত বছর বন্যার সময়ও পানি ঢুকেছিল। সংশ্লিষ্টদের বারবার জানানো হলেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’

সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা ছড়া-নালা পরিষ্কার করছেন জানিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র মখলিছুর রহমান কামরান বলেন, ‘‌বৃষ্টি আর পানি সুরমা ধারণ করতে পারছে না, যার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এটা প্রাকৃতিক কারণে হয়েছে। আমরা নগরবাসীর পাশে রয়েছি।’ 

বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেটের নদ-নদীর পানি বেড়েছে বলে জানান সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিলেটে দুটি নদীর চারটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। তবে অন্য নদ-নদীর পানি গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত বিপৎসীমার নিচে অবস্থান করছে। বৃষ্টিপাত বন্ধ হলে পানিও কমে আসবে।’