বর্তমান বিশ্বের কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রগুলো সংকটের মধ্যে রয়েছে বলে
মন্তব্য করেছেন সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুশতাক খান। তিনি বলেন, বিশ্বের কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রগুলো সুশাসনের অভাবে সংকটের মধ্যে পড়েছে।
গত বিশ বছর ধরে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ, তার বিপরীতে ইচ্ছেমতো ব্যয়, অর্থনৈতিক অস্থিরতার
কারণে কর্তৃত্বপরায়ণ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে রয়েছে।
রোববার (৫ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত প্রথম
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ‘পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে উন্নয়নের
পথ অনুসন্ধান’ প্রতিপাদ্যে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
ড. মুশতাক খান বলেন, আমাদের এখন সুশাসনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সবচেয়ে
কম দামে কীভাবে সবচেয়ে মানসম্পন্ন অবকাঠামো তৈরি করতে পারি তা নির্ধারণ করতে হবে। অনেক
উন্নয়নশীল দেশ মনে করে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে তারা এ অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করতে এবং পরিশোধ
করবে। প্রকৃতপক্ষে এটি খুবই সমস্যাপূর্ণ এবং সাধারণ বোঝাপড়া। অধিকাংশ কর্তৃত্বপরায়ণ
রাষ্ট্র কষ্ট করছে। শ্রীলঙ্কার রাজাপাকশে আমাদের সামনে বড় উদাহরণ। একবার পতন শুরু হলে
তা থামানো খুবই কঠিন হয়ে উঠবে। শ্রীলঙ্কান ৩০০ রুপি প্রতি ডলার, পাকিস্তানের ২০০ রুপি
প্রতি ডলার।
এ অধ্যাপক বলেন, গত বিশ বছরে পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে সুশাসনকে সংজ্ঞায়িত
করেছিল তা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাস্তবায়নযোগ্য ছিল না। এটা ব্যর্থ কৌশল ছিল, যা কোনো
উন্নয়নশীল দেশেই সম্ভব হয়নি। পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে সুশাসনের
আওতায় আনতে চেয়েছিল তা ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ থেকে বিশেষ করে চীন থেকে যে অর্থ
এসেছিল, যার পূর্বশর্ত সুশাসন ছিল না, এটা বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। গত বিশ বছরে
দক্ষিণের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এসেছিল। কিন্তু অবকাঠামো ঠিক
হলেও সুশাসন দুর্বল ছিল এখানে। ফলে ১০০ ডলারের রাস্তা তৈরির জন্য ২০০ ডলার ঋণ নেয়া
হয়েছে। ১০০ ডলারের রাস্তা দিয়ে ২০০ ডলারের আয় আসবে না। এমনকি ১০০ ডলারের রাস্তাও ঠিকভাবে
তৈরি হয়নি। এর মাধ্যমে যারা অর্থ গোপন করেছে তারা চাইবে নিরাপদ কোথাও অর্থ স্থানান্তরিত
করতে। ফলে হুন্ডি, ব্যাংক সমস্যা তৈরি হয়েছে। এটা এখন বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘ বলছে, ৫২ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হুমকির মুখে রয়েছে। এদের সবারই এসব সমস্যা রয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব হ্রাসের বিষয়ে তিনি বলেন, চীন, রাশিয়া, ভারত,
ব্রাজিলের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ক্ষমতার এ পরিবর্তনে
বৈশ্বিক দ্বন্ধ তৈরি হয়েছে। যখন ক্ষমতার পালাবদল হবে তখন বৈশ্বিক একটা সংঘর্ষ, দ্বন্ধ
তৈরি হবে। গত বিশ বছরে উন্নয়ন সহযোগী এবং পশ্চিমা ব্যাংক যেমন এডিবি, আইএফআইর গুরুত্ব
ক্রমাগত কমতে শুরু করেছে। এ সময়ে অন্যান্য উৎসের যেমন চীনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম খুব
দ্রুতই বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা বৈশ্বিক পরিবর্তনের একটা অংশ।
গত বিশ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগে (এফডিআই)
চীন, ভারত, দক্ষিণের দেশগুলোর বিনিয়োগ উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর তুলনায় সাড়ে তিন গুণ বেশি,
রেমিট্যান্সে তিন গুণ বেশি। বড় এ পরিবর্তন আমাদের অভ্যন্তরীণ শাসনের জন্য তৈরি হয়েছে।
আগে অর্থের বড় উৎস বিশ্বব্যাংক, পশ্চিমা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে এসেছে। পশ্চিমা দেশগুলো
চিন্তা করেছে তাদের ঋণ কীভাবে উদ্ধার করবে। এজন্য তারা সংশ্লিষ্ট দেশের শাসন ব্যবস্থাকে
উন্নত করতে চেয়েছিল। এর ফলে তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর সুশাসনের জন্য চাপ তৈরি করেছে।
ফলে চীনসহ দক্ষিণের দেশগুলো শর্তহীনভাবে ঋণ প্রদান করেছিল। এতে এসব দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি
পায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামালের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসেকা আয়েশা খান। এ সময় আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাশেদ আল তিতুমীর, বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, সিটি ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন প্রমুখ।










